কিছু ভুলে গেলে কী করবেন? আল্লাহর জিকির ও কুরআনের একটি সুন্দর শিক্ষা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ মনে হলো, চাবিটা কোথায় রেখেছি? মোবাইল ফোনটি খুঁজে পাচ্ছেন না। কারও সঙ্গে জরুরি একটি কথা বলার ছিল, কিন্তু ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন, সেটিই মনে পড়ছে না। কখনো পরিচিত মানুষের নাম, কখনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ—ছোট ছোট বিষয়ও আমরা প্রতিদিন ভুলে যাই।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বিরক্ত হয়ে পড়েন, অস্থির হয়ে যান কিংবা নিজের স্মৃতিশক্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে থাকেন।
কিন্তু একজন মুমিনের জীবন শুধু দুনিয়াবি ব্যস্ততার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের ছোট ছোট ঘটনাও তার জন্য আল্লাহকে স্মরণ করার উপলক্ষ হতে পারে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা আমাদের এমনই একটি সুন্দর শিক্ষা দিয়েছেন।
ভুলে গেলে আল্লাহকে স্মরণ করুন
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
وَاذْكُر رَّبَّكَ إِذَا نَسِيتَ
উচ্চারণ: ওয়াযকুর রাব্বাকা ইযা নাসীত।
অর্থ: আর যখন তুমি ভুলে যাও, তখন তোমার রবকে স্মরণ করো।
—সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ২৪।
এই ছোট্ট আয়াতের মধ্যে মুমিনের জন্য রয়েছে অনেক বড় শিক্ষা।
মানুষ ভুলে যায়। মানুষের স্মরণশক্তি সীমিত। কিন্তু আল্লাহ কখনো ভুল করেন না, তাঁর জ্ঞান সর্বব্যাপী। তাই কোনো কিছু ভুলে গেলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, তাঁকে স্মরণ করা এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়াই একজন মুমিনের সুন্দর অভ্যাস হওয়া উচিত।
ভুলে যাওয়ার সময় শয়তানের প্রসঙ্গ কেন এসেছে?
সূরা আল-কাহফের এই আয়াতের আগের আয়াতে আল্লাহ তাআলা ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার ব্যাপারে বলতে গিয়ে ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার শিক্ষা দিয়েছেন।
আয়াত দুটির প্রেক্ষাপটে মুফাসসিরগণ ভুলে যাওয়া, আল্লাহর স্মরণ এবং শয়তানের কুমন্ত্রণার বিষয়টি আলোচনা করেছেন।
সূরা আল-কাহফের ৬৩ নম্বর আয়াতেও আমরা দেখি, মুসা (আ.)-এর সঙ্গী মাছের ঘটনাটি উল্লেখ করার সময় বলেন, শয়তানই তাঁকে বিষয়টি স্মরণ করতে ভুলিয়ে দিয়েছিল।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, শয়তান মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করার চেষ্টা করে। আর আল্লাহর জিকির মুমিনের হৃদয়কে আল্লাহমুখী রাখে।
তবে প্রতিটি সাধারণ ভুলে যাওয়ার ঘটনাকে শয়তানের প্রভাব বলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মানুষের স্বাভাবিক ভুলে যাওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।
কিছু ভুলে গেলে কী আমল করবেন?
পরবর্তী সময়ে কোনো জিনিস কোথায় রেখেছেন মনে না পড়লে কিংবা কোনো কাজের কথা ভুলে গেলে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করতে পারেন।
১. অস্থির না হয়ে একটু থামুন
প্রথমেই নিজেকে শান্ত করুন। বারবার বিরক্ত হওয়া বা অস্থির হয়ে খোঁজাখুঁজি করার পরিবর্তে একটু সময় নিন।
২. আল্লাহর জিকির করুন
আল্লাহকে স্মরণ করুন। যেমন:
- سُبْحَانَ اللَّهِ — সুবহানাল্লাহ।
- الْحَمْدُ لِلَّهِ — আলহামদুলিল্লাহ।
- اللَّهُ أَكْبَرُ — আল্লাহু আকবার।
- أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ — আস্তাগফিরুল্লাহ।
এগুলো আল্লাহর স্মরণ ও প্রশংসার উত্তম বাক্য। এগুলো পড়ুন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর স্মরণে অন্তরকে সজীব রাখার নিয়তে।
৩. আল্লাহর কাছে সাহায্য চান
নিজের ভাষায় দোয়া করুন:
হে আল্লাহ! আপনি সবকিছু জানেন। আমি যা ভুলে গেছি, তা মনে করতে আমাকে সাহায্য করুন। আমার কাজ সহজ করে দিন এবং আমার অন্তরকে প্রশান্ত রাখুন।
৪. আবার মনে করার চেষ্টা করুন
কিছুক্ষণ শান্ত থাকার পর চিন্তা করুন—সর্বশেষ কোথায় জিনিসটি ব্যবহার করেছেন, কার সঙ্গে কথা বলেছেন কিংবা কাজটি কখন করার কথা ছিল।
প্রয়োজনে পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীর সাহায্য নিন।
মনে রাখবেন, জিকির কোনো জাদুকরী পদ্ধতি নয় যে প্রতিবারই হারানো জিনিস বা ভুলে যাওয়া কথা সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়বে। বরং জিকির হলো আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক দৃঢ় করার একটি ইবাদত।
জিকির কেন আমাদের জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ?
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র ইরশাদ করেন:
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
উচ্চারণ: আলা বিযিকরিল্লাহি তাতমাইন্নুল কুলুব।
অর্থ: জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।
—সূরা আর-রা’দ, আয়াত: ২৮।
জীবনের ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা, হতাশা ও নানা সমস্যার মধ্যেও একজন মুমিনের অন্তরের প্রশান্তির অন্যতম উৎস হলো আল্লাহর জিকির।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ
অর্থ: যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে না, তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো।
—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৬৪০৭।
সুতরাং জিকির শুধু ভুলে যাওয়ার সময়ের আমল নয়; বরং সকাল-সন্ধ্যা, চলাফেরা, কাজকর্ম এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর স্মরণ শেখান
আমরা সন্তানদের অনেক কিছু শেখাই। কীভাবে পড়াশোনা করতে হয়, কীভাবে ভালো ফলাফল করতে হয়, কীভাবে সুন্দরভাবে কথা বলতে হয়—এসব বিষয়ে যত্নবান থাকি।
কিন্তু পাশাপাশি তাদের শেখানো জরুরি:
- কোনো কাজ শুরু করার আগে বিসমিল্লাহ বলা।
- কোনো ভালো কিছু পেলে আলহামদুলিল্লাহ বলা।
- ভুল হলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- কোনো কিছু ভুলে গেলে আল্লাহকে স্মরণ করা।
- প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া শেখার অভ্যাস গড়ে তোলা।
- জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
শিশুরা ছোটবেলায় যে শিক্ষা ও অভ্যাস অর্জন করে, তা তাদের ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই লক্ষ্যেই পরিবারে দ্বীনি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং সন্তানদের জন্য মানসম্মত ইসলামি ও সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী দাওয়া সেন্টার: দ্বীনি শিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনের প্রত্যয়
সন্তানদের শুধু দুনিয়াবি শিক্ষায় শিক্ষিত করাই যথেষ্ট নয়; তাদের মধ্যে কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান, উত্তম চরিত্র, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও জরুরি।
ইসলামী দাওয়া সেন্টার (Islami Dawah Center) দ্বীনি শিক্ষা, ইসলামি জ্ঞান প্রচার এবং পরবর্তী প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠনের প্রত্যয়ে কাজ করছে।
আমাদের উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. IDC Eng Medium Madrasha
ইংরেজি মাধ্যমের মানসম্মত শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামি মূল্যবোধ, নৈতিকতা, কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা অর্জনের উপযোগী একটি শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা আধুনিক শিক্ষায় দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি দ্বীনের জ্ঞান, উত্তম চরিত্র ও আল্লাহভীতির গুণেও সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক।
২. IDC হজ কাফেলা
আল্লাহর ঘর জিয়ারত এবং পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনের স্বপ্ন পূরণে সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রত্যাশায় রয়েছে IDC হজ কাফেলা।
হজ ও ওমরাহর প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় শিক্ষা এবং সফরসংক্রান্ত সহযোগিতার মাধ্যমে হাজি ও ওমরাহ পালনকারীদের পাশে থাকার প্রত্যয় আমাদের।
৩. ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রম
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিশুদ্ধ ইসলামি জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, দৈনন্দিন জীবনের মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং পরিবার ও সমাজে দ্বীনি মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আমাদের এই উদ্যোগগুলো সম্পর্কে জানতে এবং দ্বীনি কার্যক্রমে অংশ নিতে ভিজিট করুন:
Website: https://IslamiDawahCenter.com
শেষ কথা: ভুলে গেলে হতাশ নয়, আল্লাহকে স্মরণ করুন
মানুষ হিসেবে আমাদের ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি ভুলে যাওয়ার মুহূর্তকে আল্লাহকে স্মরণ করার একটি সুযোগে পরিণত করা সম্ভব।
আজ থেকে একটি সুন্দর অভ্যাস গড়ে তুলুন।
কিছু ভুলে গেলে অস্থির না হয়ে একটু থামুন। আল্লাহর জিকির করুন। তাঁর কাছে সাহায্য চান। তারপর প্রয়োজনীয় কাজটি আবার মনে করার চেষ্টা করুন।
নিজে আমল করুন, পরিবারকে শেখান এবং সন্তানদের মধ্যেও আল্লাহর স্মরণের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি তাঁর জিকির করার, কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার এবং আমাদের সন্তানদের দ্বীনদার ও নেককার হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন।
آمِين يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ
লেখা ও প্রকাশনা: ইসলামী দাওয়া সেন্টার (Islami Dawah Center)
আরও ইসলামি শিক্ষা ও দাওয়াহমূলক লেখা পড়তে ভিজিট করুন:
https://IslamiDawahCenter.com
আমাদের উদ্যোগ: IDC Eng Medium Madrasha | IDC হজ কাফেলা | ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রম
