সবর বা ধৈর্য মুমিনের একটি জান্নাতি গুণ

সবর বা ধৈর্য মুমিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং জান্নাতি গুণ। অথচ, আমরা এই গুণটির ব্যাপারে খুব বেশি জানি না। আমরা সবর‌ এর পরিচয় এবং এর ফজীলত সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ।
সবর‌ বা ধৈর্য তিন প্রকার।
১) আল্লাহর আদেশ‌ পালনে ধৈর্যধারণ করা।
২) আল্লাহর নিষেধকৃত‌ বিষয় পরিহার করার ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা।
৩) সকল দুঃখ, কষ্ট, বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করা।
সুতরাং, নিজেদের আবেগ, অনুভূতি ও ঝোঁক প্রবণতাকে নিয়ম ও সীমার মধ্যে আবদ্ধ রেখে আল্লাহর নাফরমানিতে বিভিন্ন স্বার্থলাভ ও ভোগ-লালসা চরিতার্থ হওয়ার সুযোগ দেখে পা পিছলে না যাওয়া‌ এবং আল্লাহর হুকুম মেনে চলার পথে যেসব ক্ষতি ও কষ্টের আশংকা দেখা দেয় সেসব বরদাশত করা‌ হলো সবর। কিন্তু আমরা অনেকে শুধু তৃতীয়‌ পয়েন্টটিকেই সবর‌ বলে জানি। আসলে উপরোক্ত তিনটি গুণাবলীর‌ সমন্বয়েই একজন মুমিন সবরের‌ জীবনযাপন‌ করে।
সবরের‌ ব্যাপারে কুর‌আনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে‌ সবর‌ এর নির্দেশ দিয়ে বলেন,
فَاصۡبِرۡ صَبۡرًا جَمِیۡلًا
“সুতরাং, আপনি ধৈর্য ধারণ করুন, পরম ধৈর্য।”(সূরা মায়ারিজ‌:০৫)।
وَ اصۡبِرۡ عَلٰی مَا یَقُوۡلُوۡنَ وَ اہۡجُرۡہُمۡ ہَجۡرًا جَمِیۡلًا
“আর লোকে যা বলে, তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সৌজন্যের সাথে তাদেরকে পরিহার করে চলুন।”(সূরা মুযযাম্মিল:১০)।
فَاصۡبِرۡ عَلٰی مَا یَقُوۡلُوۡنَ وَ سَبِّحۡ بِحَمۡدِ رَبِّکَ قَبۡلَ طُلُوۡعِ الشَّمۡسِ وَ قَبۡلَ الۡغُرُوۡبِ
“অতএব, তারা যা বলে তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং আপনার রবের সপ্ৰশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে।”(সূরা ক্বাফ:৩৯)।
فَاصۡبِرۡ کَمَا صَبَرَ اُولُوا الۡعَزۡمِ مِنَ الرُّسُلِ
“অতএব, আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ় প্ৰতিজ্ঞ রাসূলগণ।”(সূরা আহক্বাফ:৩৫)।
উপরোক্ত আয়াত গুলো দ্বীনের‌ দাঈদের‌ জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ দাওয়াহর‌ কাজ করতে গিয়ে নিদারুণ‌ কষ্ট সহ্য করেছেন। তবুও‌ আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ধৈর্য‌ ধারণের উপদেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তায়ালা কিছু কিছু আয়াতে পুরো মুমিনদের‌ সম্বোধন করে সবরের‌ নির্দেশ দিয়েছেন। কুর‌আনে এসেছে,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَ الصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”(সূরা বাকারা:১৫৩)।
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اصۡبِرُوۡا وَ صَابِرُوۡا وَ رَابِطُوۡا ۟ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা করো, সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।”(সূরা আলে‌ ইমরান:২০০)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ বলেছেন,”মুমিনের ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি কাজে তার জন্য মঙ্গল রয়েছে। এটা মুমিন ব্যতীত অন্য কারো জন্য নয়। সুতরাং, তার সুখ এলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ফলে এটা তার জন্য মঙ্গলময় হয়। আর দুঃখ পৌঁছলে সে ধৈর্য ধারণ করে। ফলে এটাও তার জন্য মঙ্গলময় হয়।”(সহিহ মুসলিম:২৯৯৯)।
যারা‌ আল্লাহর বিধানকে আঁকড়ে ধরার ক্ষেত্রে এবং সকল বিপদ-আপদে সবর‌ করবে তাদের জন্য অপরিসীম পুরস্কার অপেক্ষা করছে। এ প্রসঙ্গে কুর‌আনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।”(সূরা আনফাল‌:৪৬)।
وَ اللّٰہُ یُحِبُّ الصّٰبِرِیۡنَ
“আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।”(সূরা আলে‌ ইমরান:১৪৭)।
إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّٰبِرُونَ أَجۡرَهُم بِغَيۡرِ حِسَابٖ
“ধৈর্যশীলদেরকে তো অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে।”(সূরা যুমার:১০)।
وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَٰلِكَ لَمِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ
“অবশ্যই যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে, নিশ্চয় তা দৃঢ়-সংকল্পের কাজ।”(সূরা শুরা:৪৩)।
وَ لَنَبۡلُوَنَّکُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَ الۡجُوۡعِ وَ نَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَنۡفُسِ وَ الثَّمَرٰتِ ؕ وَ بَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ. الَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَصَابَتۡہُمۡ مُّصِیۡبَۃٌ ۙ قَالُوۡۤا اِنَّا لِلّٰہِ وَ اِنَّاۤ اِلَیۡہِ رٰجِعُوۡنَ. اُولٰٓئِکَ عَلَیۡہِمۡ صَلَوٰتٌ مِّنۡ رَّبِّہِمۡ وَ رَحۡمَۃٌ ۟ وَ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُہۡتَدُوۡنَ.
“আর আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে। যারা তাদের উপর বিপদ আসলে বলে, আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয়‌ই আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের রব এর কাছ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ এবং রহমত বর্ষিত হয়, আর তারাই হিদায়েত প্রাপ্ত।”(সূরা বাকারা:১৫৫-১৫৭)।
وَ جَعَلۡنَا مِنۡہُمۡ اَئِمَّۃً یَّہۡدُوۡنَ بِاَمۡرِنَا لَمَّا صَبَرُوۡا ۟ؕ وَ کَانُوۡا بِاٰیٰتِنَا یُوۡقِنُوۡنَ
“তারা যেহেতু ধৈর্যশীল ছিল তার জন্য আমি তাদের মধ্য হতে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করতো। তারা ছিল আমার নিদর্শনাবলীতে দৃঢ় বিশ্বাসী।”(সূরা সাজদাহ‌:২৪)।
وَ لَنَجۡزِیَنَّ الَّذِیۡنَ صَبَرُوۡۤا اَجۡرَہُمۡ بِاَحۡسَنِ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ
“আর যারা ধৈর্য ধারণ করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে তারা যা করতো তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব।”(সূরা নাহল‌:৯৬)।
اُولٰٓئِکَ یُجۡزَوۡنَ الۡغُرۡفَۃَ بِمَا صَبَرُوۡا وَ یُلَقَّوۡنَ فِیۡہَا تَحِیَّۃً وَّ سَلٰمًا.
“তাদেরকে প্রতিদান হিসেবে দেওয়া হবে জান্নাতের সুউচ্চ কক্ষ। যেহেতু, তারা ছিল ধৈর্যশীল। আর তারা প্ৰাপ্ত হবে সেখানে অভিবাদন ও সালাম।”(সূরা ফুরকান:৭৫)।
وَ جَزٰىہُمۡ بِمَا صَبَرُوۡا جَنَّۃً وَّ حَرِیۡرًا
“আর তাদের সবরের পুরস্কারস্বরূপ তিনি তাদেরকে প্ৰদান করবেন উদ্যান ও রেশমী বস্ত্ৰ।”(সূরা দাহর‌:১২)।
سَلٰمٌ عَلَیۡکُمۡ بِمَا صَبَرۡتُمۡ فَنِعۡمَ عُقۡبَی الدَّارِ
“(ফেরেশতারা জান্নাতীদের বলবে,) তোমরা ধৈর্যধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি। কতই না ভালো এই পরিণাম!”(সূরা রা’দ:২৪)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ বলেছেন,”ধৈর্য হলো আলো।”(সহিহ বুখারী:২২৩)।‌ অন্য হাদিসে তিনি বলেন,”যে‌ ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করার চেষ্টা করবে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা প্রদান করবেন। আর কোনো ব্যক্তিকে এমন কোনো কিছু দেওয়া হয়নি, যা ধৈর্য অপেক্ষা উত্তম ও বিস্তর হতে পারে।”(সহিহ বুখারী:১৪৬৯)।
তাই আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা,
رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ
“হে আমাদের পরওয়ারদেগার! আমাদের জন্য ধৈর্য্যের দ্বার খুলে দাও এবং আমাদেরকে মুসলিম হিসাবে মৃত্যু দান করো।”(সূরা আরাফ‌:১২৬)।
ক্রেডিট- আল মাহমুদ ভাই