সুদের গুনাহ ব্যভিচারের চাইতেও অধিক ক্ষতিকর ।

ইসমাইল মাহমুদ

 

সুদ দেয়া ও গ্রহণ করা একটি হারাম এবং চরম ঘৃণিত কাজ। পবিত্র কোরআন এবং হাদীস শরীফে সুদ সম্পর্কে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে।

হাদীস শরীফে এসেছে ‘সুদের সত্তরটি স্তর রয়েছে। সবচেয়ে নিন্মটি হলো নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করা

’; ‘জেনেশুনে এক দিরহাম পরিমান সুদ খাওয়া আল্লাহর নিকট ছত্রিশ বার ব্যভিচারের চাইতেও অধিক গুনাহের কাজ।’ সুদের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন শরীফের আয়াত হলো- (০১) হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং লোকদের কাছে তোমাদের যে সুদ বাকি রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও, যদি যথার্থই তোমরা ঈমান এনে থাকো। (সূরা আল বাকারাহ : আয়াত : ২৭৮)

(০২) কিন্তু যদি তোমরা এমনটি না করো তাহলে জেনে রাখো, এটা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।এখনো তাওবা করে নাও এবং সুদ ছেড়ে দাও। তাহলে তোমরা আসল মূলধনের অধিকারী হবে। তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপর জুলুম করাও হবে না।(সূরা আল বাকারাহ : আয়াত : ২৭৯)

 

(০৩) যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মতো যাকে শয়তান ¯পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এই অবস্থায় উপনীত হবার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলে ‘ব্যবসা তো সুদেরই মতো।’ অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। কাজেই যে ব্যক্তির কাছে তার রবের পক্ষ থেকে এই নসীহত পৌছে যায় এবং ভবিষ্যতে সুদখোরী থেকে সে বিরত হয়, সে ক্ষেত্রে যা কিছু সে খেয়েছে তাতো খেয়ে ফেলেছেই ও এ ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ হয়ে গেছে। আর এই নির্দেশের পরও যে ব্যক্তি আবার এই কাজ করে, সে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে সে থাকবে চিরকাল।(সূরা আল বাকারাহ : আয়াত :২৭৫)

 

(০৪) আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত ও বিকশিত করেন। আর আল্লাহ অকৃতজ্ঞ দুষ্কৃতকারীকে পছন্দ করেন না।(সূরা আল বাকারাহ : আয়াত : ২৭৬)

 

(০৫) হে ঈমানদারগণ! চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খাওয়া বন্ধ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।(সূরা আলে ইমরান : আয়াত : ১৩০)

 

(০৬) সুদ গ্রহণ করার জন্য যা গ্রহণ করতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল এবং অন্যায়ভাবে লোকদের ধন-স¤পদ গ্রাস করার জন্য, আমি এমন অনেক পাক-পবিত্র জিনিস তাদের জন্য হারাম করে দিয়েছি, যা পূর্বে তাদের জন্য হালাল ছিল। আর তাদের মধ্য থেকে যারা কাফের তাদের জন্য কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তৈরী করে রেখেছি।(সূরা আন নেসা : আয়াত : ১৬১)

 

(০৭) যে সুদ তোমরা দিয়ে থাকো, যাতে মানুষের স¤পদের সাথে মিশে তা বেড়ে যায়, আল্লাহর কাছে তা বাড়ে না। আর যে যাকাত তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকো, তা প্রদানকারী আসলে নিজের স¤পদ বৃদ্ধি করে।(সূরা আর রূম : আয়াত : ৩৯)

 

সুদের বিরুদ্ধে পবিত্র হাদীস শরীফের বর্ণনা হলো- (০১) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সাঈদ (রঃ)…আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সুদের সত্তরটি স্তর রয়েছে। সবচেয়ে নিন্মটি হলো নিজ মায়ের সাথে ব্যভিচার করা। (ইবনে মাজাহ : অধ্যায় : ব্যবসা-সুদ : ২২৭৪)

 

(০২) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হানযালাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘জেনেশুনে এক দিরহাম পরিমান সুদ খাওয়া আল্লাহর নিকট ছত্রিশ বার ব্যভিচারের চাইতেও অধিক গুনাহের কাজ।’ (মুসনাদে আহমদ : ১০৩৩)

 

(০৩) হযরত মূসা ইবনে ইসমাঈল (র.), সামুরা ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আজ রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি যে, দু’ব্যক্তি আমার নিকট এসে আমাকে এক পবিত্র ভ‚মিতে নিয়ে গেল। আমরা চলতে চলতে এক রক্তের নদীর কাছে পৌছলাম। নদীর মাঝখানে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে। আরেক ব্যক্তি নদীর তীরে, তার সামনে পাথর পড়ে রয়েছে। নদীর মাঝখানের লোকটি যখন বের হয়ে আসতে চায় তখন তীরের লোকটি তার মুখে পাথর খন্ড নিক্ষেপ করে তাকে স্বস্থানে ফিরিয়ে দিচ্ছে। এভাবে সে যতবার বেরিয়ে আসতে চায় ততবারই তার মুখে পাথর নিক্ষেপ করছে আর সে স্বস্থানে ফিরে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এ কে? সে বলল, যাকে আপনি রক্তের নদীতে দেখছেন, সে হল সূদখোর।’ (বুখারী : অধ্যায় : ক্রয়-বিক্রয় : ১৯৫৫)

 

(০৪) হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী জিনিস থেকে বিরত থাক।’ জিজ্ঞেস করা হল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সা.) সে গুলো কি কি?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সাথে শরীক করা, যাদু টোনা করা, আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন এমন প্রাণীকে অকারণে হত্যা করা, এতিমের মাল আত্মসাত করা, সুদ খাওয়া, জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং সতি সাধ্বী নিষ্কলুষ মুমিন মহিলার উপর ব্যভিচারের মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা।’ (মুসলিম : কিতাবুল ইমান : ১৭০)

(০৫) হযরত আহমদ ইবনে ইউনুস (র.)…আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) সুদখোর, সুদ দাতা, এর সাক্ষী এবং সুদের হিসাব/দলীল লেখক সকলকে অভিশাপ দিয়েছেন। আর তিনি এদের সবাই কে সমান অপরাধী বলেছেন। (আবু দাউদ : অধ্যায় : ক্রয়-বিক্রয় : ৩৩০০)

 

(০৬) হযরত আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘মিরাজের রাতে আমি এমন এক গোত্রের পাশ দিয়ে গমন করি, যাদের পেট ছিল ঘরের মত বড়, যার মধ্যে বিভিন্ন রকম সাপ বাহির থেকে দেখা যাচ্ছিল। আমি জিবরাঈলকে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা হল সুদখোর।’ (ইবনে মাজাহ : অধ্যায় : ব্যবসা-সুদ : ২২৭৩)

 

আসুন আমরা সকলে মিলে আল্লাহ রাব্বুল আল আমীন ও তাঁর রাসূল (সা.)-এঁর নির্দেশিত পথে চলি। আমাদের সবাইকে আল্লাহ সুদমুক্ত থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন। [তথ্যসহায়তা : মুসলিম বিশ্ব]

 

আইডিসির সাথে যোগ দিয়ে উভয় জাহানের জন্য ভালো কিছু করুন।

 

আইডিসি এবং আইডিসি ফাউন্ডেশনের ব্যপারে বিস্তারিত জানতে  লিংক০১ ও লিংক০২ ভিজিট করুন।

আইডিসি  মাদরাসার ব্যপারে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। 

আপনি আইডিসি  মাদরাসার একজন স্থায়ী সদস্য /পার্টনার হতে চাইলে এই লিংক দেখুন.

আইডিসি এতীমখানা ও গোরাবা ফান্ডে দান করে  দুনিয়া এবং আখিরাতে সফলতা অর্জন করুন।

কুরআন হাদিসের আলোকে বিভিন্ন কঠিন রোগের চিকিৎসা করাতেআইডিসি ‘র সাথে যোগাযোগ করুন।

ইসলামিক বিষয়ে জানতে এবং জানাতে এই গ্রুপে জয়েন করুন।

 

রিবা বা সুদের প্রচলিত কয়েকটি রূপ

 

রিবা প্রধানত দুই প্রকার : ১. রিবা নাসিয়্যাহ ২. রিবাল ফযল; একে রিবাল বাইও বলা হয়। এখানে আমরা শুধু রিবা নাসিয়্যাহর প্রচলিত কয়েকটি রূপ নিয়ে আলোচনা করব। রিবা নাসিয়্যাহর সংজ্ঞা: ইমাম আবু বকর জাস্সাস রাহ. বলেন,

هو القرض المشروط فيه الأجل وزيادة مال على المستقرض.

এমন ঋণ যাতে মেয়াদ শর্ত করা হয় এবং গ্রহিতাকে অতিরিক্ত প্রদানের শর্ত করা হয়। -আহকামুল কুরআন ১/৫৫৭

অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রদানের শর্তে কাউকে মেয়াদি ঋণ দেওয়া। একে রিবাল করযও বলা হয়। রিবান নাসিয়্যাহ-এর আরেক প্রকার হল, রিবাদ দাইন।

রিবাদ দাইনের সংজ্ঞা : কারো থেকে কোনো পণ্যের বিক্রিলব্ধ বকেয়া-মূল্য পরিশোধের সময় হলে তখন অতিরিক্ত প্রদানের শর্তে মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া। অর্থাৎ অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের শর্তে সময় বাড়িয়ে নেওয়া। জাহেলী যুগে রিবা নাসিয়্যাহর উভয় প্রকারের প্রচলন ছিল খুব বেশি।

আজও এই উভয় ধরনের রিবা নাসিয়্যাহ ব্যাংকিং জগতে এবং মার্চেন্টদের সমাজে বহুল প্রচলিত। বাজারে বিভিন্ন পণ্য কিস্তিতে বিক্রি হয়। কিন্তু কিস্তি সময়মত দিতে না পারলে একটা নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত দেওয়ার শর্ত করা হয়। এটা রিবাদ দাইনের অন্তর্ভুক্ত।

 

রিবা নাসিয়্যাহর প্রচলিত রূপ ও ক্ষেত্রসমূহঃ

 

রিবা নাসিয়্যাহকে রিবাল কুরআন, রিবাল করয ও রিবাদ দাইনও বলা হয়। প্রচলিত ব্যাংকিং সুদ এর জ্বলন্ত উদাহরণ, এছাড়াও আরো ক্ষেত্র আছে, নিম্নে একেকটি করে সবিস্তারে আলোকপাত করা হল:

 

১. সুদী ব্যাংক : ব্যাংকের সংজ্ঞাতেই আছে যে, ব্যাংক হল, অল্প সুদে ঋণ নেয়, আর বেশী সুদে ঋণ দেয়। সুদী ব্যাংকের কারেন্ট একাউন্ট ছাড়া সকল প্রকার একাউন্ট সুদী একাউন্ট। তাই সুদী ব্যাংকের সেভিং একাউন্ট এবং সকল ধরনের ফিক্সড ডিপোজিট সুদী। চাই তা উচঝ হোক বা ঋউজ হোক অথবা সাধারণ ফিক্সড ডিপোজিট হোক; সবই রিবা নাসিয়্যাহ একাউন্ট। অনেকে মনে করেন সরকারী হলে সেটা আর সুদী হয় না। অথচ এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

এছাড়া কারেন্ট একাউন্টেও ইদানিং সুদের মিশ্রণ দেওয়া হয়। এ ধরনের কারেন্ট একাউন্টকে SND  কারেন্ট একাউন্ট বলে। এসকল একাউন্ট খোলাই সুদী চুক্তির গুনাহ। পরে সুদ গ্রহণ করলে তার গুনাহ ভিন্ন হবে।

সুদী ব্যাংকের সেভিং একাউন্ট খোলাটাই সুদী চুক্তির গুনাহ। তাই সুদ গ্রহণ না করলেও যে কোনো ধরনের সেভিং একাউন্ট করলে সুদী চুক্তির গুনাহ হবে।

২. ডি. পি. এস/ DPS  ডিপোজিট পেনশন স্কীম : এটিও সম্পূর্ণ সুদী একাউন্ট।

৩. সুদী ব্যাংকের যে কোনো লোনই সুদী লোন। যেমন কার লোন, হোম লোন, হাউজ লোন, ইনভেস্টমেন্ট লোন, সিসি লোন, কৃষি লোন ইত্যাদি।

৪. প্রাইজবন্ড : সরকার প্রাইজবন্ড ছাড়ে। যা যে কোনো ব্যাংক থেকে ভাঙ্গানো যায়। একটা নির্ধারিত মেয়াদের পর লটারীর মাধ্যমে ড্র করা হয়। এরপর বিজয়ীদেরকে পুরস্কার দেওয়া হয়। এই পুরস্কারটাই রিবা নাসিয়্যাহ বা সুদ। প্রাইজবন্ড ক্রয়ের মাধ্যমে ব্যাংককে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। আর ব্যাংক প্রাইজ বা পুরস্কার দেয়ার নামে ক্রেতাকে সুদ দিচ্ছে।

৫. ক্রেডিট কার্ড : ক্রেডিট কার্ড মূলত এক প্রকার সুদভিত্তিক লোন কার্ড। কেননা এই কার্ডের চুক্তিপত্রেই লেখা রয়েছে যে, মিনিমাম ডিউ টাইমে/ডেটে বাকী পরিশোধ না করলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে সুদ দিতে হবে। যার ফলে অধিকাংশ ক্রেডিট কার্ড হোল্ডারই সুদের আওতায় পড়ে যান। এই সুদ রিবাদ দাইনের অন্তর্ভুক্ত, যা রিবা নাসিয়্যাহ। তাই সুদ থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই যথাসময়ে বাকী পরিশোধ করে দিতে হবে। তাহলে আর সুদী কারবার হবে না।

৬. ক্রেডিট কার্ড দ্বারা এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন করলে  যে চার্জ নেওয়া হয় তা সুস্পষ্ট সুদ। কেননা কার্ডের ফি তো নিচ্ছেই। এখন অতিরিক্তটা ঋণের বিনিময়ে হচ্ছে।

৭. বন্ড : সরকারী এবং বেসরকারী বন্ড। এগুলো সম্পূর্ণ রিবা নাসিয়্যাহ। সরকারী হওয়ার কারণে কিংবা নির্দিষ্ট কোনো বাণিজ্যিক প্রকল্প, কোনো কোম্পানী বা রাস্তা-ঘাট কিংবা ব্রীজ নির্মাণের জন্য ঋণ নেওয়া হচ্ছে এমন কথা উল্লেখ করার কারণে কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, এটা সুদী হবে না, কিন্তু এ ধারণা ভুল। স্টক এক্সচেঞ্জ বা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য যে কোনো ব্যাংকে যে বন্ড ক্রয়-বিক্রয় হয় তাতে সুনির্দিষ্ট সুদের ঘোষণা দেওয়া থাকে।  এ সকল বন্ডও সুদী বন্ড।

৮. স্টুডেন্ট লোন : বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃক স্টুডেন্ট লোন দিয়ে যা অতিরিক্ত নেওয়া হয় সেটাও সুদ। এটি ইন্টারেস্ট বা সার্ভিস চার্জ যে নামেই নেওয়া হোক না কেন।

৯. লটারী : রেডক্রিসেন্ট বা এজাতীয় সরকার অনুমোদিত কিছু প্রতিষ্ঠান দশটাকা বিশটাকা মূল্যের লটারী টিকেট ছাড়ে। এক লক্ষ, দুই লক্ষ টাকা, গাড়ি, মোটর সাইকেল ইত্যাদি পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা নেয়া হয়।

এক্ষেত্রে পুরস্কার পায় কেবল  দু’তিনজন। আর বাকিরা কিছুই পায় না। তাদের মূল টাকাই গচ্চা যায়। এধরনের লেনদেনকেই শরীয়তের ভাষায় ‘কিমার’ বলে। যা সম্পূর্ণ হারাম। আর এক্ষেত্রে সবাই তো অতিরিক্ত পাওয়ার উদ্দেশ্যেই দশ-বিশ টাকায় লটারি ক্রয় করে থাকে। যদিও কেউ পুরস্কার পায় আর কেউ পায়া না। তাই এতে সুদও বিদ্যমান।

 

Islami Dawah Center Cover photo

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টারকে সচল রাখতে সাহায্য করুন!

 

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টার ১টি অলাভজনক দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান, এই প্রতিষ্ঠানের ইসলামিক ব্লগটি বর্তমানে ২০,০০০+ মানুষ প্রতিমাসে পড়ে, দিন দিন আরো অনেক বেশি বেড়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

বর্তমানে মাদরাসা এবং ব্লগ প্রজেক্টের বিভিন্ন খাতে (ওয়েবসাইট হোস্টিং, CDN,কনটেন্ট রাইটিং, প্রুফ রিডিং, ব্লগ পোস্টিং, ডিজাইন এবং মার্কেটিং) মাসে গড়ে ৫০,০০০+ টাকা খরচ হয়, যা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সেকারনে, এই বিশাল ধর্মীয় কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে আপনাদের দোয়া এবং আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন, এমন কিছু ভাই ও বোন ( ৩১৩ জন ) দরকার, যারা আইডিসিকে নির্দিষ্ট অংকের সাহায্য করবেন, তাহলে এই পথ চলা অনেক সহজ হয়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

যারা এককালিন, মাসিক অথবা বাৎসরিক সাহায্য করবেন, তারা আইডিসির মুল টিমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন, ইংশাআল্লাহ।

আইডিসির ঠিকানাঃ খঃ ৬৫/৫, শাহজাদপুর, গুলশান, ঢাকা -১২১২, মোবাইলঃ +88 01609 820 094, +88 01716 988 953 ( নগদ/বিকাশ পার্সোনাল )

ইমেলঃ info@islamidawahcenter.com, info@idcmadrasah.com, ওয়েব: www.islamidawahcenter.com, www.idcmadrasah.com সার্বিক তত্ত্বাবধানেঃ হাঃ মুফতি মাহবুব ওসমানী ( এম. এ. ইন ইংলিশ, ফার্স্ট ক্লাস )

 

১০. পোস্ট অফিসের সঞ্চয়পত্র : পোস্ট অফিসের মাধ্যমে সরকারীভাবে বিভিন্ন নামের সঞ্চয়পত্র স্কীম রয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পূর্ণ সুদী, রিবা নাসিয়্যাহ-এর অন্তর্ভুক্ত।

১১. জমি বন্ধক : বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায় বহুল প্রচলিত লেনদেন হল, জমি বন্ধক রীতি। জমির মালিক একটা মোটা অংকের টাকা নেয়। বিনিময়ে  বন্ধক গ্রহীতা জমিটি ভোগ করে এবং মেয়াদান্তে মালিক পুরো টাকা ফেরত দিয়ে জমিটি বুঝে নেয়। এক্ষেত্রে ঋণ গ্রহিতার জন্য বন্ধকি জমি ভোগ করা রিবা নাসিয়্যাহর অন্তর্ভুক্ত, যা হারাম। কোনো কোনো এলাকায় এটাকে জমি কট দেওয়াও বলে। আবার কেউ জমি খায়খালাসি দেওয়া বলে। নাম যাই হোক লেনদেন এবং হুকুম একই।

১২. বাড়ি বন্ধক : জমি বন্ধকের মত ঢাকা শহরে বাড়ি বন্ধকের প্রথা চালু হয়েছে। তা হল, বাড়িওয়ালা নিজ প্রয়োজনে ৫ বা ১০ লক্ষ টাকা ঋণ নেয়। বিনিময়ে পাঁচ বছর বা দশ বছর ঋণদাতাকে তার ফ্ল্যাটে বিনা ভাড়ায় থাকার সুযোগ দেয়। পরবর্তীতে যখন ঋণ পরিশোধ করে দিবে তখন এই চুক্তি সমাপ্ত হবে। এই লেনদেনও সম্পূর্ণ সুদী ও রিবা নাসিয়্যাহর অন্তর্ভুক্ত। যা সুস্পষ্ট হারাম। কেননা ঋণের কারণেই এ সুবিধা পাচ্ছে।

১৩. বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে সিকিউরিটি বেশি দিলে ভাড়া কমিয়ে দেওয়া : বাড়ি বন্ধকের উপরোক্ত পদ্ধতি নাজায়েয হওয়ার কারণে অনেকে হীলা হিসাবে এ পদ্ধতি চালু করেছে। যেমন, কোনো বাড়িওয়ালার টাকার প্রয়োজন । যেখানে সাধারণ হিসেবে অগ্রিম নেয়ার কথা ২০ হাজার টাকা, কিন্তু এর স্থলে বাড়িওয়ালা  পাঁচ লক্ষ টাকা সিকিউরিটি মানি দাবি করে এবং এর বিনিময়ে ভাড়া কমিয়ে দেয় (যেমন, সাধারণ হিসেবে ভাড়া যদি হয় ১০ হাজার টাকা এক্ষেত্রে ভাড়া হবে ১/২ হাজার টাকা)- এটাও হারাম। কেননা ৫ লক্ষ টাকা ঋণ দেওয়ার কারণেই মূলত তার থেকে ভাড়া কম নিচ্ছে। এই ঋণকে ছুতা হিসেবে সিকিউরিটি মানি বলা হয়েছে। মূলত সিকিউরিটি মানি তো সেটাই যা সচরাচর সবাই দিয়ে থাকে। যা দিলে ভাড়া কমানো হয় না। ভাড়া স্বাভাবিকই থাকে। নাম যাই দেওয়া হোক ফেরতযোগ্য ৫ লক্ষ টাকা ঋণ দেওয়ার কারণেই ১০ হাজার টাকার ভাড়া ১/২ হাজারে নেমে এসেছে।

ফাযালা বিন উবাইদ রা. বলেন, যেই ঋণ কোনো মুনাফা নিয়ে আসে তা রিবার প্রকারসমূহের একটি। -সুনানে বাইহাকী ৫/৩৫০

ইমাম মালেক রাহ. বর্ণনা করেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, যে ব্যক্তি কোনো বস্তু ঋণ দিবে সে যেন অতিরিক্ত কোনো কিছু শর্ত না করে। যদিও এক মুঠো ঘাস হোক না কেন। -মুআত্তা মালেক, হাদীস ২৫১৩

১৪. ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ড : সরকারী বা বেসরকারী ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ড সুদী ফান্ড। ঐচ্ছিক হওয়ার কারণে এতে টাকা জমা দেওয়ার অর্থ ঋণ দিয়ে পরবর্তীতে অতিরিক্ত নেওয়া। আর এটাই রিবা নাসিয়্যাহ। আর পুরো সরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রভিডেন্ট ফান্ডের বাধ্যতামূলক যে অংশ এই ফান্ডে কেটে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে এর সাথে অতিরিক্ত যে অংশ দেওয়া হয় তা সুদ নয়। তা নেওয়া জায়েয। তবে  সরকারী প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক কেটে রাখার পাশাপাশি ঐচ্ছিকও কিছু কাটানোর সুযোগ থাকে। এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকের অতিরিক্ত অংশ কাটানো সুদী চুক্তির অন্তর্ভুক্ত এবং এই অতিরিক্ত কর্তিত অংশের উপর উদ্বৃত্ত যা দিবে তা সুদ। তা নেওয়া বৈধ হবে না। তাই বাধ্যতামূলকের অতিরিক্ত উক্ত ফান্ডে জমা রাখাও জায়েয হবে না। কেননা ঐচ্ছিক অংশ রাখার অর্থই হল সুদী চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া। এছাড়া স্বায়ত্ত¡শাসিত  প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রভিডেন্ট ফান্ডের সকল টাকা সুদী ব্যাংক বা বীমাতে রেখে বৃদ্ধি করা হয়। পরবর্তীতে সেটিই তাদেরকে দেওয়া হয়। তাই এসকল প্রতিষ্ঠানের  ঐচ্ছিক ও বাধ্যতামূলক প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমার অতিরিক্ত নেওয়া জায়েজ হবে না। কেননা সেগুলোও সুদের অন্তর্ভুক্ত।

১৫. লাভের হার নির্ধারণ না করে নির্দিষ্ট পরিমাণ মুনাফা প্রদানের শর্তে বিনিয়োগ করা: ব্যাংক ছাড়াও ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যবসায়ীদেরকে ব্যবসার জন্য টাকা প্রদান  করে লাভ হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়ার শর্ত করা হয় এটাও সম্পূর্ণ সুদী লেনদেন ও সুদী বিনিয়োগ। ব্যবসার জন্য দেওয়া আর লাভ দেওয়ার কথা হলেই অনেকে মনে করেন তা ইসলামী হয়ে যায়; সুদী থাকে না। অথচ ব্যবসার জন্য টাকা দিয়ে নির্ধারিত অংকের কিছু দেওয়ার চুক্তি বা শর্ত করাই সুদ ও রিবা নাসিয়্যাহ। এক্ষেত্রে হালালভাবে বিনিয়োগ করতে চাইলে ব্যবসার প্রকৃত লাভের শতকরা হার নির্ধারণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে লাভ হলে নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী ভাগ পাবে। আর লাভ না হলে পাবে না।

কিন্তু পূর্বোক্ত লেনদেনে লাভ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু দেওয়ার কথা হলে চুক্তি অনুযায়ী সে তা দিতে বাধ্য থাকে। লাভ হোক বা না হোক সর্বাবস্থায় তাকে তা দিতেই হয়। এটাই সুদ। তদ্রƒপ কোনো কিছু নির্দিষ্ট না করে এমনিতেই ব্যবসার জন্য কাউকে টাকা দেওয়া। এক্ষেত্রে কথা হয় যে, লাভ হিসেবে প্রতিমাসে কিছু কিছু দিবে। এটাও সুদী চুক্তি এবং রিবা নাসিয়্যাহর অন্তর্ভুক্ত।

১৬. জুয়েলারী দোকানে স্বর্ণ বন্ধক রেখে সুদের উপর লোন প্রদান করা হয়। তেমনিভাবে ব্রাক, আশা, গ্রামের মহাজন সুদের ভিত্তিতে লোকদেরকে লোন দিয়ে থাকে। এগুলো সবই রিবা নাসিয়্যাহ।

১৭. ফরম বিক্রির ছুতায় রিবা নাসিয়্যাহ : কোনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সোসাইটি মানুষকে সুদবিহীন লোন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তাদের নিয়ম হল, ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী ফরম কিনতে বাধ্য করা হয় আর ঋণের হার অনুযায়ী ফরমের দাম কম-বেশি হয়। যেমন, দশ হাজার টাকা ঋণের জন্য পাঁচশত টাকার ফরম ক্রয় করতে হয়। আর বিশ হাজার টাকার জন্য এক হাজার টাকার ফরম ক্রয় করতে হয় । আর নির্ধারিত মেয়াদের ভেতর তা  পরিশোধ না করলে পরে আবারও আরেকটি ফরম ক্রয় করে পূরণ করতে হয়। বাহ্যিকভাবে এটি ফরম ক্রয়-বিক্রয়। কিন্তু এর মাধ্যমেই সুদ অগ্রীম আদায় করে নেওয়া হচ্ছে। এজন্যই ঋণের পরিমাণ বাড়লে ফরমের মূল্যও বাড়তে থাকে। এটা হচ্ছে রিবা নাসিয়্যাহ গ্রহণের হীলা-বাহানা ও ছুতা অবলম্বন।

১৮. কিস্তি-বিক্রি : বাজারে ফ্রিজ, কম্পিউটার ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী কিস্তিতে বিক্রি হয়। এই বিক্রির চুক্তিপত্রের মধ্যেই উল্লেখ থাকে সময়মত পরিশোধ করতে না পারলে একটা নির্দিষ্ট হারে সুদ বাড়বে। এটা রিবাদ দাইন ও রিবা নাসিয়্যাহর অন্তর্ভুক্ত। তাই এ ধরনের শর্ত সম্পূর্ণ নাজায়েয। আর বাধ্য হয়ে কেউ এধরনের শর্তে ক্রয় করলে নির্ধারিত মেয়াদের ভেতরই কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। নতুবা সুদ দেওয়ার গুনাহ হবে। অতএব এ ধরনের ক্ষেত্রে সুদ থেকে বাঁচতে চাইলে যথাসময়ে মূল্য পরিশোধ করে দিতে হবে।

১৯. ইনস্টাবাই : Instabuy বিভিন্ন কোম্পানী ক্রেডিট কার্ড হোল্ডারকে বিনা সুদে এবং অতিরিক্ত মূল্য ছাড়া ২/৩ বা ১২ কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধা দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রেও যথাসময়ে মূল্য পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত সুদ দিতে হয়। এতে কারবারটি সুদী কারবারে পরিণত হয়ে যায়। তাই ইনস্টাবাই-এর সুবিধা গ্রহণ করলেও যথাসময়ে কিস্তি পরিশোধের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় কারবার সুদী হয়ে যাবে। অর্থাৎ রিবাদ দাইনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে সকল প্রকার সুদ থেকে হেফাযত করুন, আমীন 

 

সুদী ব্যাংকে চাকুরী করার হুকুম :

প্রশ্ন : সুদী ব্যাংকে চাকুরী করা কি জায়েয?
উত্তর : প্রচলিত ধারার ব্যাংকের চাকরি সুদী কাজে সরাসরি সহযোগিতার শামিল। এতে চাকরি করলে শ্রমও হারাম এবং আয়ও হারাম হবে। মুসলমানদের জন্য এ ধরনের চাকরি থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
[সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮, আলআশবাহ ওয়ান-নাযায়ের ৩/২৩৪]
সুদী ব্যাংকে চাকরির আবেদন ফরম পূরণ করার হুকুম :
প্রশ্ন : আমি একটি ফটোকপি ও কম্পিউটার কম্পোজের দোকান দিয়েছি। এতে আমি নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে অনলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন চাকরির আবেদন ফরম পূরণ করে দিই। আমার জন্য কি কোনো সুদী ব্যাংকে চাকরির আবেদন ফরম পূরণ করা জায়েয হবে?
উত্তর : প্রচলিত ধারার ব্যাংকে চাকরি করা নাজায়েয। কেননা এ ব্যাংকগুলোর প্রধান ও মূল কাজই হলো সুদের আদান-প্রদান। সুতরাং ব্যাংকের চাকরির জন্য আবেদন ফরম পূরণ করে দেওয়া নাজায়েয কাজে সহযোগিতা করার অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন-
وَ تَعَاوَنُوْا عَلَی الْبِرِّ وَ التَّقْوٰی ۪ وَ لَا تَعَاوَنُوْا عَلَی الْاِثْمِ وَ الْعُدْوَانِ ۪ .
‘এবং নেকি ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা কর এবং গুনাহের কাজ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যের সহযোগিতা করো না।’ [সূরা মায়েদা (৫) : ২]
অতএব সুদী ব্যাংকে চাকরির আবেদন ফরম পূরণ করে দেওয়া বৈধ হবে না।
কোন্ ব্যাংকে টাকা জমা রাখা যাবে?
প্রশ্ন : বর্তমানে অনেকের ইচ্ছা না থাকলেও একরকম বাধ্য হয়েই ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে হয় এবং লেনদেন করতে হয়। তাই কোন্ ব্যাংকে টাকা জমা রাখা এবং লেনদেন করা জায়েয ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ?
উত্তর : বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারার ব্যাংকসমূহে কারেন্ট একাউন্ট (চলতি হিসাব) তথা সুদবিহীন হিসাব খুলে লেনদেন করা জায়েয। তবে এসব ব্যাংকে কোনো ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব খোলা জায়েয হবে না। প্রাপ্ত সুদ নিজে ভোগ না করলেও এসব সুদী একাউন্ট খোলাই জায়েয নয়। কেননা সুদী ব্যাংকে যে কোনো ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব খোলাই মূলত সুদী চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া।
আর এদেশে প্রচলিত ইসলামী ব্যাংকগুলোতে নিজে মুনাফা গ্রহণ না করার প্রত্যয় নিয়ে সঞ্চয়ী হিসাব খোলা যাবে। কেননা এসব ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবগুলো মুদারাবা ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তাই এক্ষেত্রে সুদী চুক্তি হয় না। তবে যেহেতু এই ধারার ব্যাংকগুলোর যথাযথভাবে শরীয়া পালনের বিষয়টি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে তাই এ ধরনের হিসাব থেকে প্রাপ্ত মুনাফা সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দেওয়াই নিরাপদ।
[সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮, ১৫৯৯; তাফসীরে কুরতুবী ৩/২২৫ (সূরা বাকারা : ২৭৫); তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ১/৬১৯]
সুদী ব্যাংকে ট্রাঞ্জেকশন বা কারবার করা যাবে কি?
প্রশ্ন : প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোতে ট্রাঞ্জেকশন করা যাবে কি না? আর এসব ব্যাংকে চাকরি করা বৈধ হবে কি না?
উত্তর : প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো সুদী অর্থনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। সুদ আদানপ্রদানই এসব ব্যাংকের মূল ও প্রধান কাজ। বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় এসব ব্যাংকই হচ্ছে সুদের প্রচার ও প্রসারের প্রধান মাধ্যম। আর ব্যাংকে কর্তব্যরত ব্যক্তি বিভিন্ন উপায়ে সুদী কারবারের সাথে সরাসরি জড়িত। সুদ দেওয়া-নেওয়া যেমন হারাম তেমনি অন্যের সুদী কারবারে জড়িত হওয়াও হারাম। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু সুদদাতা ও গ্রহীতাকে লানত করেননি; বরং এর লেখক (অর্থাৎ সুদের হিসাব-কিতাবকারী) ও সাক্ষীগণকেও অভিসম্পাত করেছেন।
হযরত জাবির রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদ গ্রহণকারী ও সুদ প্রদানকারী এবং সুদের লেখক ও সাক্ষীদ্বয়ের উপর লানত করেছেন। [সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৮]
সুতরাং একজন মুসলমানের জন্য প্রচলিত ধারার ব্যাংকে চাকরি করা এবং এর বেতনাদি ভোগ করা বৈধ নয়।
আর সুদভিত্তিক হওয়ায় এসব ব্যাংকে সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাব বা বিভিন্ন মেয়াদের সঞ্চয়ী হিসাব খোলা কিংবা সুদের ভিত্তিতে যে কোনো ধরনের ঋণ গ্রহণ করা হারাম। কেউ এমন হিসাব খুলে ফেললে তা দ্রুত বন্ধ করে দিতে হবে এবং এ থেকে প্রাপ্ত সুদ সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দিতে হবে।
অবশ্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে এসব ব্যাংকে চলতি হিসাব খোলা, টিটি, পে-অর্ডার ইত্যাদি সুদবিহীন লেনদেন করা জায়েয।
[তাফসীরে কুরতুবী ৩/২২৫ (সূরা বাকারা : ২৭৫); তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম ১/২১৯] সূত্র: মাসিক আল কাউসার

আইডিসির সাথে যোগ দিয়ে উভয় জাহানের জন্য ভালো কিছু করুন।

 

আইডিসি এবং আইডিসি ফাউন্ডেশনের ব্যপারে বিস্তারিত জানতে  লিংক০১ ও লিংক০২ ভিজিট করুন।

আইডিসি  মাদরাসার ব্যপারে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। 

আপনি আইডিসি  মাদরাসার একজন স্থায়ী সদস্য /পার্টনার হতে চাইলে এই লিংক দেখুন.

আইডিসি এতীমখানা ও গোরাবা ফান্ডে দান করে  দুনিয়া এবং আখিরাতে সফলতা অর্জন করুন।

কুরআন হাদিসের আলোকে বিভিন্ন কঠিন রোগের চিকিৎসা করাতেআইডিসি ‘র সাথে যোগাযোগ করুন।

ইসলামিক বিষয়ে জানতে এবং জানাতে এই গ্রুপে জয়েন করুন।

Islami Dawah Center Cover photo

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টারকে সচল রাখতে সাহায্য করুন!

 

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টার ১টি অলাভজনক দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান, এই প্রতিষ্ঠানের ইসলামিক ব্লগটি বর্তমানে ২০,০০০+ মানুষ প্রতিমাসে পড়ে, দিন দিন আরো অনেক বেশি বেড়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

বর্তমানে মাদরাসা এবং ব্লগ প্রজেক্টের বিভিন্ন খাতে (ওয়েবসাইট হোস্টিং, CDN,কনটেন্ট রাইটিং, প্রুফ রিডিং, ব্লগ পোস্টিং, ডিজাইন এবং মার্কেটিং) মাসে গড়ে ৫০,০০০+ টাকা খরচ হয়, যা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সেকারনে, এই বিশাল ধর্মীয় কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে আপনাদের দোয়া এবং আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন, এমন কিছু ভাই ও বোন ( ৩১৩ জন ) দরকার, যারা আইডিসিকে নির্দিষ্ট অংকের সাহায্য করবেন, তাহলে এই পথ চলা অনেক সহজ হয়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

যারা এককালিন, মাসিক অথবা বাৎসরিক সাহায্য করবেন, তারা আইডিসির মুল টিমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন, ইংশাআল্লাহ।

আইডিসির ঠিকানাঃ খঃ ৬৫/৫, শাহজাদপুর, গুলশান, ঢাকা -১২১২, মোবাইলঃ +88 01609 820 094, +88 01716 988 953 ( নগদ/বিকাশ পার্সোনাল )

ইমেলঃ info@islamidawahcenter.com, info@idcmadrasah.com, ওয়েব: www.islamidawahcenter.com, www.idcmadrasah.com সার্বিক তত্ত্বাবধানেঃ হাঃ মুফতি মাহবুব ওসমানী ( এম. এ. ইন ইংলিশ, ফার্স্ট ক্লাস )

 

ব্যাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি ও একটি কথোপকথন

— শিবলু, বাংলাদেশ ব্যাংকের AD তে এপ্লাই করো নাই?

– না। আসলে আমি যে খুব ভালো কাজ করি তা না, কিন্তু সুদ খেয়ে জাহান্নামে যেতে পারবো না।

— তুমি কি বলতে চাও, বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিও হারাম?

– আমার ব্যাংক নিয়ে যতটুকু নলেজ আছে, সুদ নিয়ে যা জানি তাতে আমি কিছুতেই বাংলাদেশ ব্যাংকে জব করা কেন হালাল হবে তা বের করতে পারিনি। জানেন তো ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক হচ্ছে ঋণ দানের শেষ আশ্রয়স্থল’! মানে সুদী সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখার শেষ আশ্রয়স্থল। যেসব উলামা’ বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করা হালাল বলেছেন, তাঁদের মতামতের স্ট্রং কোনো ইভিডেন্স আমি দেখিনি। আপনি দেখে থাকলে আমাকে জানাতে পারেন। কে না চায় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জব করতে! শাইখ সালিহ আল মুনাজ্জিদকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “আমি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি যেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিল্ডিং মেইনটেইন্যান্সের কাজে জড়িত, আমার চাকরি কি হালাল হবে?” উনি যা বললেন তার সারমর্ম হলো, “কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অথবা একে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ইকুইপমেন্ট সাপ্লাই দেয় এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা হালাল নয়। কারণ এটা পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করা।”[১]

— আচ্ছা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাকরি তো সরকারি চাকরি!

– সরকারি চাকরি হলেই সব হালাল হয়ে যায় এমন উসূল আমার জানা নেই। মূল বিষয় আপনি কী কাজ করে সরকার থেকে টাকাটা নিচ্ছেন। আপনি যদি পাপ কাজে সহযোগিতা করে সরকার থেকে টাকা নেন, তা হারাম হবে আর সরকারি মাদ্রাসায় কুর’আন শিক্ষা দিয়ে সরকার থেকে টাকা নেন তা হালাল হবে।

— দেখো, তুমি তো জানো, মৃত পশুর গোস্তও হালাল হয়ে যায়!

– এখানে শর্ত হলো যদি কারো অন্য কোনো অপশন না থাকে, তার জীবন বা শরীরের অঙ্গহানি হওয়ার আশংকা থাকে তাহলে মৃত পশু খেতে পারে, ততটুকু যতটুকু খেলে বিপদ কেটে যাবে! বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি না করলে জীবন বিপদসংকুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমার আপাতত নেই!

— দেখো, পুরো অর্থনীতি তো সুদের উপর দাঁড়িয়ে আছে, কোথায় তুমি চাকরি করবে যেখানে সুদ নেই!

– এই কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চাকরিকে জাস্টিফাই করে না যেটা সরাসরি সুদের সাথে জড়িত। সুদের সাথে জড়িত মানে, যে সুদ দেয়, যে নেয়, যে সাক্ষী থাকে আর যে হিসাব রাখে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যারা এই চার কাজে নেই, তারা পড়বে সুরা মায়েদার ওই আয়াতের আন্ডারে যেখানে বলা আছে, “পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর।”[২] আর অন্য প্রতিষ্ঠান হলো ভিন্ন। এক হলো আপনার মূল কাজটাই হারাম, আরেকটা হলো মূল কাজটা হালাল। যেটার মূল কাজ হালাল আর কিছু হারাম ইলিমেন্ট আছে সেখানে ইনকামের হারাম অংশটা বাদ দিয়ে দিবেন।

— দেখো, চাকরির বাজারের যে অবস্থা, এভাবে চাকরির অপশনগুলো বাদ দিলে চাকরি করবো কোথায়!

– আল্লাহ’র ওপর ভরসা রাখুন। জানেন তো আল্লাহ্‌ বলেছেন, “আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। আল্লাহ তার কাজ পূর্ণ করবেন।”[৩]

তথ্যাবলীঃ

[১] IslamQA
[২] আল কুর’আন ৫:২
[৩] আল কুর’আন ৬৫:২-৩

সুদ ও মুনাফা’র পার্থক্য

কনভেনশনাল অর্থনীতি কিংবা বিজনেস এর বই গুলোতে সাধারণত সুদ ও মুনাফার মধ্যে পার্থক্য করা হয়না। ইসলামে যেহেতু সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তাই সুদ ও মুনাফার পার্থক্য নির্ণয় জরুরী।

“আল্লাহ’তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন” (কোরআন, ২:২৭৫)

ইকোনমিক দিক থেকে বলতে গেলে সুদ যা করে তা হচ্ছে, ‘মুষ্ঠিমেয় কিছু লোকের কাছে সম্পদ পুঞ্জিভূত করতে প্রধান অস্ত্র হিসেবে কাজ করে’। ইসলামিক ইকোনমি’র একটা উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে নিম্নের আয়াতে।

“যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান শুধু তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য্য আবর্তন না করে” (কোরআন, ৫৯:৭)

তাই সুদকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে, যেহেতু সুদ সম্পদকে বিত্তবানদের হাতে পুঞ্জিভূত করে। তাই ইসলাম সুদের সাথে জড়িত দের চিরস্থায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করেছে।

“এবং যারা (সুদ) পুনঃগ্রহণ করবে তারাই হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে” (কোরআন, ২:২৭৫)

যাই হোক, সুদ কীভাবে সম্পদকে বিত্তবানদের হাতে পুঞ্জিভূত করে তা আজকের আলোচনার বিষয় নয়। এই আর্টিকেলে খুব সংক্ষেপে এই বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে।

প্রফিট কি?

আল্লাহ্‌ কোরাআনে সুদ কে হারাম করে এর বিকল্প যা দিয়েছেন তা হচ্ছে ‘আল-বাই’ বা বাণিজ্য, ট্রেড।

“আল্লাহ’তাআলা ব্যবসায়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন” (কোরআন, ২:২৭৫)

ধরুন, আপনার কাছে ২ কেজি চাল আছে। এখন আপনি ১ কেজি চাল ভোগ করার পর ২য় কেজি আর এখন খেতে আগের মত ইচ্ছুক নন। একজন মানুষ যখন কোন কিছুর ১ম ইউনিট ভোগ করে, ২য় ইউনিট ভোগ করার প্রতি আস্তে আস্তে তার আগ্রহ কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় এটাকে বলে ‘ডিমিনিশিং মার্জিনাল ইউটিলিটি’। ধরা যাক, ১ম কেজি চাল ভোগ করে সে ১০০ ইউটিলস[] পেয়েছে আর ২য় কেজি ভোগ করার পর পেয়েছে ৫০ ইউটিলস। তাহলে তার মোট ইউটিলিটি বা সেটিসফেকশন এর পরিমাণ হল ১০০ + ৫০ = ১৫০ ইউটিলস।

দেশে আরেকজন ব্যক্তির কথা চিন্তা করুন, যার ২ কেজি ডাল আছে। এবং ১ম ব্যক্তির মতো ১ম কেজি ডাল ভোগ করে সে পেল ১০০ ইউটিলস এবং ‘ডিমিনিশিং মার্জিনাল ইউটিলিটি’ অনুসারে ২য় কেজিতে পেল ৫০ ইউটিলস। সর্বমোট তার সেটিসফিকশন এর পরিমাণ ১০০+৫০ = ১৫০ ইউটিলস।

এখন একটা দেশে যদি শুধু এই দু’জন ব্যক্তিই থাকে, তাহলে পুরো ইকোনমিতে টোটাল সেটিশফেকশান কত? ১ম ব্যক্তির ইউটিলস + ২য় ব্যক্তির ইউটিলস = ১৫০+১৫০ = ৩০০ ইউটিলস।

আমাদের সবসময় উদ্দেশ্য থাকে নিজের সন্তুষ্টি বা সেটিসফিকশন বাড়ানো। ইকোনমি’র ভাষায় ইউটিলিটি বাড়ানো। এখন এই দুই ব্যক্তি একে অন্যের সাথে ট্রেড (আল-বাই) করল, যা কোরআনে ‘সুদ’ এর বিকল্প হিসেবে দেয়া হয়েছে। ট্রেড এর ফলে ১ম ব্যক্তি ২য় ব্যক্তিকে ১ কেজি চাল দিল এবং ২য় ব্যক্তি ১ম ব্যক্তিকে ১ কেজি ডাল দিল।

প্রত্যেকে নতুন দ্রব্য থেকে ১০০ ইউটিলস করে সাটিসফেকশন পাবে, যেহেতু এর পূর্বে তারা এটা ভোগ করে নি। তাহলে ১ম ব্যক্তির কাছে আছে ১ কেজি চাল (১০০ ইউটিলস) এবং ১ কেজি ডাল (১০০ ইউটিলস), মোট ইউটিলিটি’র পরিমাণ হল ১০০ + ১০০ = ২০০ ইউটিলস। তদ্রুপ ২য় ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটবে। এখন প্রত্যেকের লাভ কত করে হল?  ৫০ ইউটিলস করে। অর্থাৎ আগে সেটিসফেকশান এর পরিমাণ ছিল ১৫০ ইউটিলস, আর ট্রেড এর ফলে হলো ২০০ ইউটিলস। মোট ইকোনমিতে ইউটিলিটির পরিমাণ হলো ২০০+২০০ = ৪০০ ইউটিলস। ট্রেড এর আগে যা ছিল ৩০০ ইউটিলস। এই প্যারাটি খুব মনোযোগ দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করুন, পুরো আর্টিকেল এর কি-পয়েন্ট এখানেই।

সোজা কথায়, প্রফিট বা মুনাফা হলো ‘মার্জিনাল ইউটিলিটি’র মোট বৃদ্ধি’ ( Total Increase in Marginal Utility)। অর্থাৎ ট্রেড এর ফলে উভয়পক্ষের যে মার্জিনাল ইউটিলিটি বৃদ্ধি পায়, তাই হচ্ছে মুনাফা। কোরআনের নিম্নের আয়াত এই বিষয়টিরই সমর্থন করছে।[২]

“হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্মতিক্রমে ব্যবসা ব্যতীত অন্যায়ভাবে পরস্পরের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করোনা … ।” (কোরআন, ৪:২৯)

তাহলে বাণিজ্যের ফলে-

০১। অর্থনীতিতে কোন সম্পদ বৃদ্ধি না পেলেও মোট সেটিসফেকশন (ইউটিলিটি) বৃদ্ধি সম্ভব।

০২। উভয় পক্ষই লাভবান হয়, এটা ‘জিরো সাম গেম’ নয়, যেখানে শুধু এক পক্ষ লাভবান হয়, যেমনঃ সুদ, জুয়া, লটারী ইত্যাদি।

০৩। মুনাফা লাভ সম্ভব।

উপরের উদাহরণগুলো, বার্টার ইকোনমির। মানিটারি ইকোনমিতে মানি’কে যেহেতু ‘ভ্যালু পরিমাপক হিসেবে’ ধরা হয়, তাই ইউটিলিটিকেও শুধু মানিটারি টার্মে কনভার্ট করা হবে।

সুদ কী?

সুদ হল, আমি আপনাকে ১ কেজি চাল ধার দিলাম এবং ১ বছর পর আপনি আমাকে ২ কেজি চাল দিবেন, এই ১ কেজি চালের দাম যদি ১০০ টাকা ধরা হয়, তবে আমি আপনাকে ১০০ টাকা দিলাম, ১ বছর পর আপনি আমাকে ২০০ টাকা দিবেন। এই যে বাকী ১০০ টাকা আপনি আমাকে দিবেন, এর বিপরীতে আমি আপনাকে কি দিচ্ছি? এখানে কাউন্টার ভ্যালু কোথায়? কিছুই না। এভাবেই যাদের কাছে অর্থ আছে তারাই আরো সম্পদ বাড়াচ্ছে কোন ঝুঁকি ছাড়াই। কারণ আধুনিক ‘ব্যাংক’ গুলো যখন লোন দেয়, তখন সিকিউরিটি হিসেবে আপনার কোন সম্পদ (কোলাটেরাল) জমা রাখে, তাই আপনি পরে সুদসহ মূলধন ফেরত না দিতে পারলেও ব্যাংকের (আধুনিক জমিদার) কোন চিন্তা নেই।

সুদ হল, ঋণ থেকে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থ, যা ঋণগ্রহীতা ঋনদাতাকে দিয়ে থাকে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ নোট

ইসলাম ‘অর্থ (Money)’ কে কোন প্রোডাক্ট বা পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়না। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে কোন বাড়তি অর্থ গ্রহণই সুদ। অর্থ হচ্ছে ‘মিডিয়াম অব এক্সচেঞ্জ’ বা ‘বিনিময়ের মাধ্যম’। কিন্তু সেক্যুলার অর্থনীতিতে ‘অর্থ’ নিজেই একটি কমোডিটি বা পণ্য, যার বিনিময়ে (অন্য কোন পণ্যের বিনিময় ছাড়াই) বাড়তি অর্থ নেয়া বৈধ।

উপরের উদাহরণে চলে যাওয়া যাক। ১ম ব্যক্তির কাছে ২ কেজি চাল আছে, এখন এই ২ কেজি চাল উৎপাদনে খরচ হয়েছে ১৫০ টাকা। এখন এই ব্যক্তি এগুলো বিক্রয় করল ২০০ টাকা মূল্যে। এখানে প্রফিট হল ৫০ টাকা।

১ম ব্যক্তিটি এখানে ‘ঝুঁকি নিচ্ছে, কারণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি ক্রেতা পাওয়া না যায়, তবে সব চালই নষ্ট হয়ে যাবে, ক্রেতা খোঁজার জন্য তাকে কাজ করতে হচ্ছে, প্রচেষ্টা করতে হচ্ছে এবং সর্বপরি ক্রেতা যদি চাল কিনে নিয়ে বিক্রেতার কথা মতো সঠিক চাল না পায় তবে বিক্রেতাকে চাল ‘পরিবর্তন’ করে দিতে হবে, এখানে লাইবিলিটি বা দায় থাকতেছে।

ইসলামী অর্থনীতির পরিভাষায়, এই (০১)ঝুঁকি (০২)কাজ ও প্রচেষ্টা এবং (০৩)দায় গ্রহণ এই তিনটিকে বলে কাউন্টার ভ্যালু, যা বিক্রেতাকে তার পণ্যের জন্য বাড়তি ৫০ টাকা বেশী মূল্য গ্রহণে বৈধতা দেয়।

ইবনু আল’আরাবীর (মৃত্যু ১১৪৮ খ্রিস্টাব্দ) মতে, “যেকোন বৃদ্ধি যাতে সমপরিমাণ কাউন্টার ভ্যালু নেই তাই রিবা (সুদ)”।[৩]

মূল কথা হলঃ

০১। ঋণ থেকে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থ সুদ। অতিরিক্ত অর্থের জন্য কোন কাউন্টার ভ্যালু নেই এবং সম্পদ কিছু লোকের হাতে পুঞ্জিভূত হচ্ছে।

০২। পণ্য বিনিময় থেকে পাওয়া অতিরিক্ত অর্থ মুনাফা, যার কাউন্টার ভ্যালু হল ঝুঁকি, দায়, কাজ ও প্রচেষ্টা। ট্রেড এর ফলে উভয়েই উপকৃত হয়।


[১] কাল্পনিক ইউটিলিটি বা সন্তুষ্টি বা উপযোগীতা পরিমাপের একক।

[২] আহমেদ কামিল মাইদিন মিরা ও হামিদা মোবাশ্বেরা, Revisiting the concept of money, profit & interest from the perspective of value and diminishing marginal utility, Available here (আরো বিস্তারিত জানার জন্য লিঙ্কে ক্লিক করে আর্টিকেল টি পড়ার অনুরোধ রইল)।

[৩] Saiful Azhar Rosly, Critical Issues on Islamic Banks & Financial Markets.

 

ইসলামিক ব্যাংকিং – সংশয় নিরসন: মুরাবাহা ও টাইম ভ্যালু অব মানি

 

মুরাবাহা হচ্ছে ইসলামিক ব্যাংকিং এর বহুল প্রচলিত একটি ফাইনান্সিং মোড। মুরাবাহাতে কোন পণ্য বিক্রির সময় ব্যাংকগুলো ক্যাশ প্রাইস এর চেয়ে ক্রেডিট প্রাইস বেশি নির্ধারণ করে। অর্থাৎ কোন পণ্য এখন ক্রয় করলে ১০০ টাকায় ক্রয় করা যেত। কিন্তু ক্রেতার কাছে যেহেতু এখন ১০০ টাকা নেই, তাই সে বাকিতে ক্রয় করল, মূল্য পরিশোধ করবে কিছু সময় পরে। বিক্রেতা এখন সময়ের কারণে মূল্য বাড়িয়ে ১২০ টাকা নির্ধারণ করল। এখানে বাড়তি ২০ টাকা আসল সময়ের ফলে। ‘সময়’ এখানে একটা ফ্যাক্টর যা মূল্য বৃদ্ধি করে। এটা কি রিবা? ইসলাম কি টাইম ভ্যালু অব মানিকে সমর্থন করে? এই আর্টিকেল পড়লে ইসলামিক ব্যাংকিং এর এই বিষয়গুলো নিয়ে সংশয় নিরসন হবে ইনশাআল্লাহ।

মুরাবাহা কি?

বাই-মুরাবাহা ব্যবসায়ের একটা মোড। টেকনিক্যালি এটা হচ্ছে ‘খরচ+মুনাফা’ বিক্রয়। বিক্রেতা এখানে পণ্য যেই মূল্যে ক্রয় করেছে তা বলে দেয় এবং বিক্রেতা ও ক্রেতা ‘মুনাফা’ কত হবে তা নির্ধারণ করে। এতে করে যেসব ক্রেতা বাজার সম্পর্কে তেমন ধারণা রাখে না, তাদের সুবিধা হয়। কারণঃ বিক্রেতাকে পণ্যের ক্রয়মূল্য (খরচ) বলে দিতে হয়।

ব্যাংক কীভাবে ‘মুরাবাহা’ ব্যবহার করে?

ব্যাংক এটাকে ফাইনান্সিং এর একটা মোড হিসেবে ব্যবহার করে। যা হলো ক্রেডিট মুরাবাহা। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। আপনি একটা পণ্য কিনবেন, কিন্তু আপনার কাছে টাকা নাই। আপনি ইসলামিক ব্যাংকে যাবেন। আপনি যেই পণ্যটি কিনতে চান, তার বর্ণনা ব্যাংককে বললেন। ব্যাংক ঐ পণ্যটি ক্রয় করল অন্য কারো থেকে ১০০ টাকা দিয়ে। এবং আপনার কাছে আরো ৫০ টাকা মুনাফায় ১৫০ টাকা বিক্রয় করল। আপনি প্রতি মাসে ১০ টাকা করে আগামি ১৫ মাসে ইন্সটলমেন্টে ১৫০ টাকা পরিশোধ করে দিলেন। অর্থাৎ ব্যাংক আপনার কাছে বাকিতে বিক্রয় করল। এই পদ্ধতিটিকেই বলে ক্রেডিট মুরাবাহা।

সমস্যাটা কোথায়?

আপনি যদি বাকিতে না ক্রয় করে নগদ মূল্যে মার্কেট থেকে পণ্যটি ক্রয় করতেন তবে মূল্য হতো ১২০ টাকা। অর্থাৎ ক্যাশ প্রাইস (নগদ মূল্য) আর ক্রেডিট প্রাইস (বাকিতে মূল্য) এর মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। এই পার্থক্যের কারণ ক্রেতা পণ্যের মূল্য দেরিতে পরিশোধ করছে। অর্থাৎ প্রাইসের বৃদ্ধি = সময়। অনেকেই বলে থাকেন, এটা টাইম ভ্যালু অব মানি তাই রিবা, এটাই সংশয়।

ইসলামিক ব্যাংকিং: মুরাবাহা ও টাইম ভ্যালু অব মানি

একটা বিষয় ক্লিয়ার হওয়া দরকার, তা হলো ইসলাম বাকিতে ক্রয়-বিক্রয়ে কোন বাধা নিষেধ আরোপ করেনি। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধারে পণ্য ক্রয় করেছেন।

‘আয়িশাহ (রাযি.) হতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ইয়াহূদির নিকট হতে নির্দিষ্ট মেয়াদে মূল্য পরিশোধের শর্তে খাদ্য ক্রয় করেন এবং তার নিকট নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রাখেন”। (সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশন, অধ্যায় ৩৪/ক্রয়-বিক্রয়, হাদীস নং: ২০৬৮)

কোন পণ্যের মূল্য বিভিন্ন কারণে বাড়তে পারে। যেমন- একটা পণ্য চট্টগ্রামে ২০ টাকা, কিন্তু ঢাকায় ৩০ টাকা হতে পারে। এখানে ফ্যাক্টর হচ্ছে ‘স্থান’। আবার ধরুন, একদিন বিকালে কাটাবনে আপনি গেলেন বই কিনতে। মুফতি তাকী উসমানী’র ‘ইসলামিক ব্যাংকিং ও অর্থায়ন পদ্ধতি’ বইটা আপনার কাছে রাখল ১০০ টাকা। অন্যদিকে আপনার বন্ধু সকালে একই বই কিনেছে ১১০ টাকা দিয়ে। তাহলে এখানে কি ১০ টাকা সুদ হবে? উত্তর – না। ক্রেতা ও বিক্রেতা কোন মূল্যের ওপর একমত হলেই হলো। এখানে ক্রেতা ১০ টাকা বেশি দিচ্ছে কারণ তার বারগেইনিং (Bargaining) পাওয়ার কম। এভাবে বিভিন্ন কারণে মূল্যের তারতম্য হতে পারে, যেমন ধরুন আপনাকে একজন বিক্রেতা ভালো জানে, সে আপনার কাছ থেকে ১০ টাকা কম রাখল। এখানে ফ্যাক্টর হচ্ছে ‘বিক্রেতার সাথে সম্পর্ক’ ইত্যাদি। অর্থাৎ মূল বিষয় হল : ক্রেতা ও বিক্রেতা মূল্যের ওপর একমত হওয়া। আল্লাহ বলেছেন,

“…কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসায় করা হয় তা বৈধ…” (আল কুরআন ৪:২৯)

‘টাইম (সময়)’ কি প্রাইস নির্ধারণে একটা ফ্যাক্টর হতে পারে? উত্তর হচ্ছে: হ্যাঁ, পারে। কিছু বিপরিত মত থাকলেও, চার মাযহাব ও বেশিরভাগ স্কলার এই বিষয়ে একমত।

হানাফি মাযহাব: “দেরিতে পরিশোধের বিনিময়ে মূল্য বাড়তে পারে” [১]

মালিকি মাযহাব: “বেশি সময়ের জন্য কিছু পরিমাণ মূল্যের সাথে যোগ হতে পারে” [২]

শাফি’ঈ মাযহাব: “নগদে পাঁচ দেরিতে পরিশোধে ছয়ের সমান” [৩]

হাম্বলি মাযহাব: “দেরি মূল্যের সাথে কিছু যোগ করে” [৪]

বর্তমান সময়ের শাইখ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) ও মুফতি তাকী উসমানী (হাফিজাহুল্লাহ) ক্রেডিট প্রাইস বেশি হতে পারে বলে মত দিয়েছেন। [৫]

এক্ষেত্রে দলিল হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, “আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন” (আল কুরআন ২:২৭৫) এবং “হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ”। (আল কুরআন ৪:২৯)

আয়াতগুলোর সাধারণ অর্থ হচ্ছে ব্যবসা বৈধ। ক্রেতা বিক্রেতার পরস্পরের সম্মতিক্রমে, ক্রেতা যদি বাকিতে মূল্য পরিশোধের নিমিত্তে বেশি মূল্য দিতে রাজি হয়, তা বৈধ। এক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই সুবিধা পাচ্ছে এবং ‘পরস্পরের সম্মতিক্রমে’ হচ্ছে, কোন জুলুম হচ্ছে না। কারণ জুলুম ‘পরস্পরের সম্মতিক্রমে’ হয়না।

এছাড়া ইসলামে বাই-সালাম বা অগ্রিম বিক্রয় শরীয়ত দ্বারা সমর্থিত।

ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আগমন করেন তখন লোকেরা এক বা দু’ বছরের বাকিতে [রাবি ইসমাঈল সন্দেহ করে বলেন, দু’ অথবা তিন বছরের (মেয়াদে) খেজুর সলম (পদ্ধতিতে) বেচা-কেনা করত।] এতে তিনি বললেন, যে ব্যক্তি খেজুরে সলম করতে চায় সে যেন নির্দিষ্ট মাপে এবং নির্দিষ্ট ওজনে সলম করে। (সহিহ বুখারি, তাওহীদ পাবলিকেশনঃ ২২৩৯ আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৮০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০৯৭)

স্কলাররা (বাই আস-সালাম) এর উইজডম উল্লেখ করেছেন যে এতে বিক্রেতা তাড়াতাড়ি টাকা পেয়ে যায় এবং ক্রেতা কম মূল্যে পণ্য পায়। অর্থাৎ তাড়াতাড়ি পরিশোধের জন্য মূল্য কম। এটা (বাই আস-সালাম) নির্দেশ করে যে, পণ্য মূল্যে টাইম একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে। এতে কোন সমস্যা নেই। [৬]

 

কনভেনশনাল ঋণের সাথে এর পার্থক্য কোথায়?

 

মক্কার কাফেররা এর পার্থক্য বুঝতো না। কারণ তারা টাকা ধার দিলে, একটা নির্দিষ্ট সময় পর যখন ঋণগ্রহিতা টাকা ফেরত দিতে পারতো না, তখন তারা মূল ঋণের সাথে বাড়তি টাকা যোগ করে দিত এবং পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দিত। অর্থাৎ অতিরিক্ত টাকা = অতিরিক্ত সময়। তাই তারা বলতো, “তারা বলে: ক্রয়-বিক্রয়ও তো সুদ নেয়ারই মত!” (আল কোর’আন ২:২৭৫)। স্কলাররা এই আয়াত থেকেও দলিল নিয়েছেন যে, সময় মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাই রিবা ও ব্যাবসায় এর একটা সদৃশ দেখেই কাফেররা বলেছিল, “ক্রয়-বিক্রয়ও তো সুদ নেয়ারই মত!” (আল কোর’আন ২:২৭৫)। কিন্তু আল্লাহ্‌ বলেছেন, “তারা বলে: ক্রয়-বিক্রয় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।” (আল কোর’আন ২:২৭৫)

পার্থক্য হচ্ছে, ইসলাম মানি কে কনভেনশনাল সিস্টেমের মতো পণ্য হিসেবে দেখে না। তাই কাউকে ঋন দেয়া হলে, সময়ের কারণে ঋনের সাথে কিছু বাড়তি যুক্ত হলে তা সুদ হবে। এখানে সময়ের কারণে ঋনের সাথে বাড়তি যুক্ত হচ্ছে টাকার বা মানি’র ওপর, যা রিবা। অন্যদিকে বাই মুরাবাহাতে সময় একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে, যার কারণে মূল্য বৃদ্ধি ঘটে পণ্যের। ক্রয় বিক্রয় যখন সম্পন্ন হয়, তখন পণ্যের মালিকানা হস্তান্তরিত হয় ক্রেতার নিকট। এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা পরস্পরের সম্মতিক্রমে মূল্য ঠিক করবে। একটি মূল্যই ঠিক করবে, এবং ক্রয়-বিক্রয় শেষ হবে। বিক্রেতা যেহেতু মূল্য পরে পাবে তাই এটা এখন রুপ নিবে ঋণে (আদ-দাইন)। অর্থাৎ একবার পণ্যের বিপরীতে মূল্য ঠিক করার পর, এখন তা আদ-দাইন বা ঋন। ঋণ হওয়ার পর বিক্রেতা আর মূল্য বাড়াতে পারবেনা, কারণ তখন তা হবে সময়ের বিপরীতে অতিরিক্ত বৃদ্ধি যা হবে ঋণের বা মানি’র বিপরীতে, যা রিবা।

সারকথা

১। পণ্যের মূল্য নির্ধারণে বিক্রেতা ‘সময়’ কে একটা ফ্যাক্টর ধরতে পারে। এটা রিবা হবেনা। বরং পুরো মূল্যটাই পণ্যের বিপরীতে থাকবে। এটাকে অনেকে বলে পজিটিভ টাইম প্রেফারেন্স।

২। দরদাম এর মাধ্যমে একবার মূল্য ঠিক হলে, পণ্যের মালিকানা ক্রেতার নিকট হস্তান্তরিত হয় এবং ক্রেতা বিক্রেতার কাছে ঋণী হয়। এখন ক্রেতা ঋণগ্রহীতাতে রুপান্তরিত হলো, আর মূল্য হলো ঋণে (আদ-দাইন)। ক্রেতা যদি সঠিক সময়ে মূল্য পরিশোধ করতে না পারে তবে বিক্রেতা/ঋণদাতা এখন আর মূল্য বাড়াতে পারবেনা, বাড়ালে রিবা হবে। অর্থাৎ, একবার মূল্য ঠিক হলে, পরে আর বাড়ানো যাবে না।

৩। ঋণ বা মানি কোন পণ্য নয়। কাউকে কিছু দিনের জন্য টাকা ব্যবহার করতে দিলে, এর ওপর বাড়তি আদায় করা হলেই, তা রিবা হবে, যাকে বলা হয় রিবা আল-নাসিয়া। আল্লাহ্‌ বলেছেন, “…কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে…”। (আল কোর’আন ২:২৭৯) অর্থাৎ ঋণের ক্ষেত্রে মূলধণের অতিরিক্ত রিবা’র অন্তর্ভুক্ত।

 

গ্রন্থ বিবরণী:

১. আইয়ুব, ম. (২০০৭), Understanding Islamic Finance, লন্ডন: জন উইলি এন্ড সন্স

২. উসমানি, ম. ত. (১৯৯৮), An Introduction to Islamic Finance, করাচী

৩. http://www.inceif.org/blog/usury-profit-time-value-money-tvm


[১] বাদা’ই আল-সানা’ই ৫/১৮৭

[২] বিদা’য়াত আল-মুজতাহিদ ২/১০৮

[৩] আল ওয়াযীজ, আল গাজ্জালী ১/৮৫

[৪] ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ২৯/৪৯৯

[৫] দেখুনঃ শাইখ মুনাজ্জিদ (হাফিজাহুল্লাহ) এর এই ফতোয়াটি এবং মুফতি তাকী উসমানীর ‘An Introduction to Islamic Finance’ বইটি।

[৬] https://islamqa.info/en/13973

 

ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং: ব্যাংক কীভাবে টাকা তৈরি করে?

 

প্যারা ১: টাকার মেশিন ও শুরুর কিছু কথা

টাকার মেশিন রিলেটেড কিছু গল্প কম বেশী সবাই শুনেছি। আপনাকে একটা টাকার মেশিন দেয়া হলে আপনি কী করবেন? ইচ্ছামতো টাকা প্রিন্ট করবেন আর তা দিয়ে অন্যজনের সম্পদ কিনতে থাকবেন। এভাবে কয়েক বছরের মধ্যে আপনিই হয়ে যাবেন দেশের বেশিরভাগ সম্পদের মালিক। কিন্তু এই পদ্ধতি ভালো না। কিছুদিন পরই দেশের মানুষ বিদ্রোহ করবে এই বলে যে, তাদের সবাইকে একটা করে টাকার মেশিন দিতে হবে। কিন্তু! এ কী করে সম্ভব?

সরকার তখন আপনাকে বলল, ওকে বাপু! তুমি আর এভাবে টাকা ছাপিওনা। তুমি শুধু বছরে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকাই ছাপাবে আর তা দিয়ে সরাসরি মানুষের ধন-সম্পদ কিনতে পারবেনা, মানুষকে লোন দিবে। ১০০ টাকা লোন দিলে তারা তোমাকে ১৫ টাকা সুদ দিবে। এই ১৫ টাকা দিয়ে তুমি সম্পদ কিনবে। সরকার এই রেগুলেশনের নাম দিলো ‘ব্যাংকিং এক্ট’। মানুষতো বেজায় খুশি, তারা এখন সহজে লোন পাচ্ছে। আপনাকে শুধু সুদের সামান্য টাকা দিতে হচ্ছে! আপনিও টাকা ছাপিয়ে মানুষের ধন-সম্পদ কিনতে থাকলেন। তবে একটু ধীরে সুস্থে, সময় নিয়ে, যেহেতু সুদ কিছু সময় পরই নিতে হয়! মানুষও এখন আর বিদ্রোহ করবেনা, তারাতো লোন পাচ্ছে। আর আপনিও যেহেতু চালাক হয়ে গিয়েছেন তাই তাড়াহুড়া করে মানুষের সব সম্পদ কিনছেন না। সুদের মাধ্যমে অল্প অল্প করে কিনছেন, এর থেকে সরকারকে কিছু টাকাও দিচ্ছেন। আপনিও খুশী, সরকার, জনগণ সবাই খুশি! সুদ হচ্ছে ঝোঁকের মতো, রক্ত চোষার সময় মানুষ টের পায়না, রক্ত চোষা বন্ধ করলেই টের পায়। কেন বিশ্বের ৬৫১ জন ধনী বাকী বিশ্বের সব মানুষ থেকে বেশি সম্পদের মালিক। কেন ফুট ওভার ব্রীজের নিচ্ছে শীতে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মানুষ শুয়ে রাত পার করে তা বুঝতে এতক্ষণে আপনার কষ্ট হওয়ার কথা নয়। কুরআনের নিচের আয়াতটির সাথে উপরের সিস্টেমটির মিল পাচ্ছেন কিনা দেখুন তো।

“তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না। এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্নসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কতৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না”। (আল কুরআন ২:১৮৮)

আপনি কি জানেন বাংলাদেশের ৫০ এর বেশী ব্যাংকের কাছে এই রকম মেশিন দেয়া হয়েছে? এরা ঝোঁকের মতো আমার আপনার সম্পদ চুষে নিয়ে তাদের রক্ষক দের হাতে তুলে দিচ্ছে?

প্যারা ২: ব্যাংককে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়

ব্যাংক বা ব্যাংকিং কি? পশ্চিমাদের লিখিত যে কোন বইতে সোজা উত্তর: পাবেন, ব্যাংক হচ্ছে একটা ইন্টারমিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান যা জনগণ থেকে ডিপোজিট নেয় একটা নির্দিষ্ট সুদের হারে এবং লোন দেয় নির্দিষ্ট সুদের হারে। এই দুই (ডিপোজিট রেট ও লেন্ডিং রেট) সুদের হারকে বলে স্প্রেড, যা ব্যাংকের প্রফিট। তারা আপনাকে একাউন্টিং এর মাধ্যমে দেখিয়েও দিবে। চলুন তাদের হিসাব নিকাশ দেখা যাক।

ধরুণ, কোন এক ব্যাক্তি ব্যাংকে ১০০০ টাকা ডিপোজিট করল। ব্যাংকের ব্যালেন্সশীট তখন হবে এই রকম।

T-01

ছকের বাম পাশে ১০০০ টাকা হলো সম্পদ, এটা এখন ব্যাংকের হাতে আছে আর ডান পাশের ডিপোজিট ১০০০ টাকা দায়, যেহেতু এই টাকা ডিপোজিটরদেরকে ফেরত দিতে হবে। ব্যাংক ডিপোজিট এর একটা অংশ জমা রাখে। এটার হার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিক করে দেয়, ধরুণ এই হার ১০%। এখন ব্যাংক ডিপোজিট এর ১০% রেখে বাকী টাকা লোন দিবে।

T-02

এখন লোনের ওপর সুদ ১০% এবং ডিপোজিট এর ওপর সুদ ৫% হলে (ডিপোজিট রেট লেন্ডিং রেট এর চেয়ে সাধারণত কম হয়ে থাকে), ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্ট হবে নিম্নরুপ। (সুদ সহ ক্যালকুলেশন)

T-03

এই যে ক্যালকুলেশন তা আপনি ব্যাংকিং সংক্রান্ত যে কোন বইতে পাবেন। এই যে গল্পটা বলা হয় তা এই যাবৎ ব্যাংক সম্পর্কে সবচেয়ে বড় মিথ্যা! ব্যাংক ইন্টারমিডিয়ারি, জনগণের টাকায় ব্যবসা করে, এসব খুব সাজানো গোছানো মিথ্যা কথা। এসবই আমাদের পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে গলাধঃকরণ করানো হয়। মূল কথা হলো ব্যাংক টাকা ক্রিয়েট করে। লোন দেয়ার জন্য ব্যাংকের পাবলিক ডিপোজিট দরকার নেই। বরং লোন দিয়েই ব্যাংক ডিপোজিট ক্রিয়েট করে। পাবলিকের কাছ থেকে ডিপোজিট দরকার লিকুইডিটি মেইনটেইনেন্স এর জন্য।

প্যারা ৩ঃ বর্তমান সেক্যুলার ইকোনমির বৈশিষ্ট্য

বর্তমান মানিটারি সিস্টেম সম্পর্কে একটু ধারণা পাওয়া যাক।

ফিয়াট মানিঃ বিশ্বের অলমোস্ট সব মানিই এখন ফিয়াট মানি। সংক্ষেপে যে মানির বিপরীতে গোল্ড জমা থাকেনা তাই ফিয়াট মানি। কিছু লোক বলতে পারেন, বাংলাদেশে টাকার বিপরীতে গোল্ড জমা থাকে। যদি বলা হয়, আচ্ছা আমার কাছে ১ লক্ষ টাকা আছে, এই টাকার বিনিময়ে ব্যাংকে গেলে ব্যাংক কি আমাকে গোল্ড দিবে? কি পরিমাণ দিবে? উত্তর: দিবেনা। এটাই ফিয়াট মানি। ব্যাপারটা এমনঃ কেউ বলল, আমার কাছে ২ আউন্স স্বর্ণ আছে, তাই আমি আনলিমিটেড টাকা ছাপাতে পারব! যদি নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট স্বর্ণ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা যায়, তবেই তা ফিয়াট হবেনা। কারণ তখন প্রত্যেকের টাকার বিনিময়ে গোল্ড জমা থাকছে। ঐটাও ফিয়াট নয় যার নিজস্ব ভ্যালু আছে যেমনঃ অতীতে ব্যবহৃত গোল্ড দিনার বা সিলভার দিরহাম।

ফিয়াট মানির সমস্যাটা কি? সমস্যাটা হলো, সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছা করলেই টাকা ছাপাতে পারে। কমার্শিয়াল ব্যাংক গুলোও ক্রেডিট ক্রিয়েশন এর মাধ্যমে টাকা ক্রিয়েট করতে পারে। কিন্তু ইচ্ছা করলেও আর গোল্ড বানানো যায়না।

ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং: এক কথায় ব্যাংক ডিপোজিট এর পুরোটা ক্যাশ রিজার্ভ না রেখে, একটা নির্দিষ্ট অংশ জমা রাখে, এই নির্দিষ্ট অংশকে স্ট্যাটিউটোরি লিকুইডিটি রিজার্ভ বলা হয়। এর হার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঠিক করে দেয়। বাংলাদেশে বর্তমানে এর হার ১৯.৫%। এই আর্টিকেলে আমি ১০% রিজার্ভ রিকার্মেন্ট ধরেছি, ক্যালকুলেশন এর সুবিধার জন্য।

প্যারা ৪: ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং এর ইতিহাস

ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং এর ইতিহাসটা একটু সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন। স্বর্ণকার এর আবির্ভাবের পর, মানুষ স্বর্ণকার এর নিকট নিরাপত্তার (সেফ কিপিং) জন্য গোল্ড জমা রাখত। অতীতে গোল্ডই ছিল মানি। দৈনন্দিন যেটুকু গোল্ড প্রয়োজন শুধু তা উত্তোলন করত। সবর্ণের বিপরীতে গোল্ড স্মিথ (সবর্ণকার) মানুষকে একটা স্লিপ দিত, লিখা থাকত, ‘I owe You’, মানে আমি আপনার কাছে ঋণী। সবাই জানত এই স্লিপের বিপরীতে গোল্ড জমা আছে। মানুষজন স্বর্ণ বাদ দিয়ে দিন দিন এই স্লিপ দিয়েই ট্রানজেকশন শুরু করে দিল। স্বর্ণকার দেখলো দৈনিক স্বর্ণ উত্তোলন এর পরিমাণ খুবই কম। মোট রিজার্ভের/ডিপোজিটের একটা ক্ষুদ্রাংশ। মানুষ এই স্লিপ দিয়েই লেনদেন করছে। স্বর্ণকার এখন ইচ্ছা মতো স্লিপ ছাপাতে থাকে আর লোন দিতে শুরু করে। এই স্বর্ণকার এর পন্থাই এখন ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং বলে পরিচিত। পার্থক্য হলো ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং কে বর্তমানে বৈধতা দেয়া হয়েছে!

প্যারা ৫: ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং; ব্যাংক কীভাবে টাকা তৈরী করে?

চলুন দেখা যাক, ব্যাংক কীভাবে কাজ করে। পূর্বের উদাহরণেই যাওয়া যাক। বুঝার সুবিধার্থে ধরে নেই পুরো দেশে একটিই ব্যাংক আছে কিংবা দেশের সব ব্যাংক একসাথে মার্জ করেছে।

এক ব্যাক্তি ব্যাংকে ১০০০ টাকা ডিপোজিট দিল। ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল রেকর্ড নিম্নরুপ।

T-04

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেট করল, ব্যাংককে ডিপোজিটের ১০% ক্যাশ রিজার্ভ রাখতে হবে। এই ক্যাশ রিজার্ভ রাখা হয় দৈনন্দিন উত্তোলন এর জন্য। এখন ব্যাংকের ফাইনাইন্সিয়াল স্টেটমেন্ট এর দিকে তাকান। ক্যাশ রিজার্ভ আছে ১০০%। ১০০০ টাকা ডিপোজিট এর বিপরীতে ১০০০ টাকা ক্যাশ রিজার্ভ। যেহেতু ডিপোজিটের শুধুমাত্র ১০% ক্যাশ রিজার্ভ রাখা লাগবে, তাই ব্যাংক ডিপোজিট বৃদ্ধি করতে থাকবে যতক্ষণ না ক্যাশ রিজার্ভ ১০০০ ডিপোজিটের ১০% না হয়। এখন কীভাবে ব্যাংক ডিপোজিট বৃদ্ধি করবে? উত্তর: লোন এর মাধ্যমে! কেউ যখন লোন নিতে আসবে, তখন ব্যাংক  লোন বৃদ্ধি করবে আর ডিপোজিটও সম পরিমাণ বৃদ্ধি করে দিবে। এই কাজটা ব্যাংক করে প্রতিবার লোন দেয়ার সময়। চলুন ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্ট এইবার দেখে আসি।

T-05

এখন ১০০০০ ডিপোজিট এর ১০% ক্যাশ রিজার্ভ আছে ১০০০। এইভাবেই ব্যাংক তৈরী করলো ৯০০০ টাকা। এইভাবে ১০০০ টাকা ডিপোজিট নিয়ে ব্যাংক আরো ৯০০০ টাকা ডিপোজিট ক্রিয়েট করতে পারে, (১০০০/.১০)। লক্ষণীয় এই ৯০০০ টাকা ইকোনমিতে প্রবেশ করলো সম্পূর্ণ লোন হিসেবে যার ওপর সুদ চার্জ করা হবে। ধরলাম ডিপোজিট এর ওপর সুদ এর হার ৫% আর লোন এর ওপর ১০%। এই দুই সুদের ব্যবধানটাই ব্যাংকের প্রফিট।  চলুন, আবার ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্টে ফিরে যাই।

T-06

৯০০০ টাকা লোন এর ওপর ১০% সুদ  ৯০০ টাকা এবং ডিপোজিট ১০০০০ এর ওপর ৫% সুদ ৫০০ টাকা। ব্যাংকের প্রফিট (৯০০-৫০০) = ৪০০ টাকা। ব্যাংকের মুনাফা ৪০০ টাকা প্রকৃত ডিপোজিট ১০০০ এর ৪০%! এইবার ব্যাংকের ডেফিনেশন দেয়া যাক। ব্যাংক কি করে? ব্যাংক হাওয়া থেকে টাকা তৈরী করে মানুষকে লোন দেয় এবং এর ওপর সুদ চার্জ করে। ও হ্যাঁ! পাবলিকের ডিপোজিট জমা রাখে লিকুইডিটি মেইনটেইনেন্স এর জন্য!  এই ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন। না দেখলেও চলবে।

অনেকেই এই ব্যাপারটা ধরতে পারেন না। কীভাবে ব্যাংক ১০০০ টাকার বিপরীতে ৯০০০ টাকা লোন দেয়! আমি লোন নিলে তো পুরো টাকা তুলে খরচ করব। ব্যাংক তো আমাকে প্রকৃত টাকাই দিতে হবে। ধরুণ, আপনি লোনের টাকা দিয়ে ১ কেজি কমলালেবু কিনেছেন। এখন আপনি যার কাছ থেকে কিনলেন, সেও তার টাকা ব্যাংকেই ডিপোজিট করবে। এইবার একটু বড় লেভেলে চিন্তা করুন। ১০০০ টাকা নয় ১০০০ কোটি টাকা। কেউ কি এই টাকা নিজের হাতে রাখবে? না। এই টাকা ব্যাংকে জমা দিবে, আর নিজের প্রয়োজনে উত্তোলন করবে প্রতিদিন কিছু অংশ। পুরো ইকোনমিতে এই অংশটা হলো ১০%, মোট ডিপোজিটের। এই টাকাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাপায় বা ইস্যু করে। ইকোনমিতে যেই টাকা একজনের হাত থেকে অন্যজনের হাতে লেনদেন হয়, আমরা দেখি, তা হলো ১০%। বাকী ৯০% টাকার, যা ব্যাংক তৈরী করে, আসলে কোন অস্তিত্বই নেই, এমনকি তা পেপার মানিও নয়। ব্যাংক যা তৈরী করে তা কম্পিউটারের এক্সেল শীটে কিছু একাউন্টিং রেকর্ড। কিন্তু এই একাউন্টিং রেকর্ডই মানুষ লোন নেয় এবং এর ওপর ইন্টারেস্ট দেয়! স্বর্ণকার এর ইতিহাসের সাথে মিল পাচ্ছেন তো!

প্যারা ৬: সলিউশান ও শেষ কথা

দুঃখ জনক হলেও সত্য, বর্তমান সিস্টেমে চলা ইসলামিক ব্যাংক গুলোও একই কাজ করে। শুধু তাদের ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্ট এ লোন এর জায়গায় একাউন্ট রিসিভএবলস বা দেনাদার লিখা থাকে। এক্ষেত্রে করণীয় কী?

শর্টটার্ম সলিউশন

০১। সুদী ব্যাংকগুলো থেকে লোন নেয়া অফ করে দিতে হবে। ডিপোজিট দেয়াও অফ করে দিতে হবে।

লংটার্ম সলিউশন

০২। ফিয়াট মানির জায়গায় গোল্ড দিনার বা দিরহাম এর প্রবর্তন করতে হবে, যা অনেক স্কলারের নিকট শার’ঈ মানি। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এই আর্টিকেলটি পড়ে নিন ।

অনেকেই হয়তো ইসলামিক ব্যাংকগুলোর ১০০% রিজার্ভ রিকারমেন্ট এর কথা বলবেন। তবে সমস্যা হলে ইসলামিক ব্যাংকগুলো যদি ১০০% রিজার্ভ রিকারমেন্ট মেইনটেইন করে এবং অন্য সুদী ব্যাংকগুলো এই ভাবে লোন দিতে থাকে, আর মানি ক্রিয়েট করতে থাকে, তবে ইসলামিক ব্যাংকগুলো কম্পিটিশনে পিছিয়ে যাবে, এবং ইকোনমিতে তাদের টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মুসলিমরা(?) কি সুদী ব্যাংকে ডিপোজিট কিংবা লোন দেয়া সম্পূর্ণরুপে পরিহার করে ইসলামিক ব্যাংকগুলোতে ট্রান্সজেকশন শুরু করবে? সমস্যার মূল উৎস ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং নয়, মূল উৎস ফিয়াট মানি। কারণ, মানি যদি গোল্ড দিনার হয়, তবে ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং এর দ্বারাও ব্যাংক গুলো টাকা তৈরী করতে পারবেনা। একাউন্টিং এ ডেবিট ক্রেডিট করেতো আর গোল্ড সৃষ্টি হয়না!

বর্তমানে এই রকম আনজাস্ট মানিটারি সিস্টেমের ওপর ইসলামিক ব্যাংকগুলো চলতে পারেনা। তবে সমস্যা অবশ্যই দুই’দিনে সমাধান হবেনা। ইসলামিক ব্যাংকিং সিস্টেম হচ্ছে প্রথম স্টেপ যা ইকোনমিকে ইসলামিক ইকোনমিতে রুপান্তর করবে। এক্ষেত্রে ব্যাক্তিগতভাবে আমাদের করণীয় সম্পূর্ণরুপে সুদী ব্যাংক এবং নন-ব্যাংক ফাইনান্সিয়াল কোম্পানী গুলোকে পরিহার করা এবং মানুষকে এই বিষয়ে এডুকেট করা, ইসলামিক ইকোনমি নিয়ে সেমিনার কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এই বিষয়ে এই আর্টিকেলে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে।


গ্রন্থ বিবরণীঃ

০১। আহামেদ কামাল মাইদীন মীরা (২০০২) দ্যা ইসলামিক গোল্ড দিনার । সিলাঙ্গুরঃ পিলান্ডুক পাবলিকেশন্স।

০২। আহামেদ কামাল মাইদীন মীরা (২০০৪) দ্যা থেফট অব নেশন্সঃ রিটার্নিং টু গোল্ড । সিলাঙ্গুরঃ পিলান্ডুক পাবলিকেশন্স।

০৩। আহামেদ কামাল মাইদীন মীরা এবং এম, লারবানী (২০০৯) ওনারশীফ ইফেক্টস অব ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ সিস্টেম ।

০৪। এম ডি সানী এবং এস আরফা এবং এ কে এম মীরা এবং এ আজীউদ্দীন (২০১০) ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং এবং মাকাসীদ আল শরীয়াহঃ এন ইনকম্প্যাটিবল প্রাক্টিস । কুয়ালালাম্পুরঃ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া

০৫। এম এ হানিফ এবং ই আর বারাকাত (২০০৬) মাস্ট মানি বি লিমিটেড টু অনলি গোল্ড এন্ড সিলভার ।

 

ফিয়াট (FIAT) মানির ইতিকথা। ইকোনমিক রি-কোলোনিয়ালাইজেশন !

দু’টো দেশের কথা চিন্তা করুন। একটি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, বিশেষ করে গোল্ড এবং অন্যটি কিছুটা কম উন্নত। দু’টো দেশের মানুষই সুখে শান্তিতে বসবাস করছে। প্রথমটি গোল্ডকে মুদ্রা বা কারেন্সি হিসেবে ব্যবহার করে আর দ্বিতীয়টি বার্টার (পণ্যের বদলে পণ্যের বিনিময় প্রথা) সিস্টেমে চলে। যা-ই হোক, প্রত্যেকটা দেশের মানুষ ভালোভাবেই চলছে, সৎভাবে জীবন যাপন করছে।

দূরের কোনো দেশ থেকে দু’জন ব্যক্তি একটা টাকার মেশিন নিয়ে ১ম দেশটিতে আসলো, এবং তাদের বললো গোল্ড ব্যবহার অনেক সমস্যাকর, ঝুঁকিপূর্ণও বটে। এই দু’জন ব্যক্তি মানুষকে পরামর্শ দিলো সবাই যাতে সব গোল্ড জমা দিয়ে এর বিপরীতে পেপার মানি নিয়ে যায়। এক গোল্ডের বিনিময়ে একটা কাগুজে মুদ্রা। মোট ১০০০ গোল্ড জমা হলো এবং ১০০০ টি কাগুজে মুদ্রা সবাইকে দেওয়া হলো এবং বলা হলো যে, কেউ ইচ্ছা করলে যে কোনো সময় কাগুজে মুদ্রা জমা দিয়ে গোল্ড নিয়ে যেতে পারবে।

মানুষ গড়ে সাধারণত ১০০ টার বেশি গোল্ড ব্যবহার করতো না, পেপার মানি দিয়েই সব কাজ করতো। কিছুদিন পর এই লোক দু’টি একটা অসৎ উপায় অবলম্বন করলো। তারা ২য় দেশটিকেও বার্টারের পরিবর্তে কাগুজে মুদ্রার পরামর্শ দিলো এবং যথারীতি আরো ১০০০ কাগুজে মুদ্রা ছাপিয়ে দিলো ঋণ হিসেবে, যা এক বছর পর ১৫% সুদ সহকারে ফেরত দিতে হবে। ২য় দেশের মানুষ তো খুব খুশি এই কাগুজে মুদ্রা দেখে।

যেহেতু প্রথম দেশের মানুষের জন্য গড়ে ১০০ টার বেশি গোল্ড রাখতে হচ্ছে না, মোট গোল্ডের ১০%। তাই এই দুই ব্যক্তি আরো ঋণ দেওয়া শুরু করলো, যার পরিমাণ এসে দাঁড়ালো ১০০০০ এ (১০০০/.১০=১০০০০)। এই দুইজন ব্যক্তি দু’টি দেশেই এসব ঋণ দিলো পূর্বের সুদের হারে। সোজা কথায় ১০০০ গোল্ডের বিপরীতে ইকোনমিতে মোট কাগজ ছাড়া হলো ১০০০০ টি, যার মধ্যে ৯০০০ টাকা ঢুকেছে আবার ঋণ হিসেবে।

বছর শেষে এই দুই ব্যক্তি সবাইকে ঋণ পরিশোধ করার জন্য বললো, সুদ সহ ঋণের পরিমাণ এখন ১০৩৫০। (সুদ = ৯০০০×.১৫=১৩৫০)। কিন্তু এই দু’টি দেশে এক হাজার গোল্ড এবং বাকি ৯০০০ ফিয়াট মানি (যেই মানির বিপরীতে গোল্ড জমা নেই) সহ মোট মুদ্রার পরিমাণ ১০০০০। যেহেতু ঋণের (সুদ সহ) চেয়ে মুদ্রার সংখ্যা কম, তখন মানুষের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করলো, এই দু’টি শান্তির দেশে শুরু হলো অরাজকতা। যেভাবেই হোক, ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

কিন্তু কিছু লোক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলো, যেহেতু মোট মুদ্রার চেয়ে  ঋণের পরিমাণ  ৩৫০ টাকা বেশি, তাই অনিবার্যভাবেই কিছু লোক ব্যর্থ হলো। তখন এই টাকার মেশিন বানানো দুই ব্যক্তি কিছু লোকের সম্পদ হস্তগত করে নিলো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় আর কিছু লোককে আর কিছু কাগজ ছাপিয়ে দিলো (লোন রিশিডিউলিং/রিস্ট্রাকচারিং)। বছর ঘুরতে আবারও একই দশা। মোট ঋণ (সুদ সহ) কোনোভাবেই পরিশোধ সম্ভব হচ্ছে না, এভাবে এক জন এক জন করে সবার সম্পদ হস্তগত করে নেয়া হলো। এখন দূর দেশ থেকে টাকার মেশিন নিয়ে আগত এই দুই ব্যক্তি হয়ে বসলো এই দু’টো দেশের নিয়ন্ত্রক, শুধু একটা কাগজ ছাপানোর মেশিনের কল্যাণে। আর শান্তির এ দু’টো দেশে শুরু হলো দরিদ্রতা, ঋণ খেলাপী কার্যক্রম। আগে যারা সুখে শান্তিতে ছিলো, এখন সারা দিন পরিশ্রম করেও ঋণ পরিশোধ হচ্ছে না, চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছেই, বাড়ছেই।

এবার একটু থামুন, এবং জাতীয় ক্ষেত্রে এই দু’টি মানুষের জায়গায় ব্যাংকগুলোর কথা চিন্তা করুন আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আইএমএফ কিংবা যারা ডলার ইউরো ছাপায় তাদের কথা মাথায় রাখুন। আর মাথায় রাখুন ১৯৭১ এ ব্রিটেন উডস কলাপস করার পরে কাগুজে মুদ্রার বিপরীতে পর্যাপ্ত গোল্ড না রেখে ডলার রাখার প্রথা শুরু হয়।

 

ব্যাংক: কতটুকু দরকার?

ইকোনমিতে ব্যাংকের রোলটা আসলে কী? মূলত ব্যাংক যেই কাজটি করে সেটা হলো, যাদের কাছে টাকা আছে (সারপ্লাস ইউনিট) তাদের থেকে যাদের টাকা দরকার (ডেফিসিট ইউনিট) তাদেরকে সরবরাহ করে।

মুসলিম বিশ্বে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিলো না, ব্যাংক মুসলিম বিশ্বে এসেছে কলোনিয়ালাইজেশনের হাতে হাত ধরে। সুদের বিনিময়ে অর্থায়নের সিস্টেম সেই প্রাচীন কালের। বনী ইসরাঈলকে আল্লাহ্‌ সুদ নিতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু তারা নিলো।

 

“আর এ কারণে যে, তারা সুদ গ্রহণ করতো, অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিলো এবং এ কারণে যে, তারা অপরের সম্পদ ভোগ করতো অন্যায় ভাবে।” [সূরাহ আন-নিসা ৪:১৬১]

ইসলামিক ব্যাংকিং এখন বাস্তবতা, অনেক বছর ধরে মুসলিম বিশ্বের স্কলারদের গবেষণার ফসল। অনেকেই একটা ক্লেইম করে তা হলো ইসলামে ব্যাংকের কোনো ধারণা নেই এবং এর দরকার নেই। যেহেতু এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সময় ছিলো না, তাই এটা হারাম। প্রথমত ব্যাংকের দরকার আছে কি নেই সেটা পরেই আলোচনা করা যাক। দ্বিতীয়ত রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সময় বা মুসলিম বিশ্বে পূর্বে কোনো সিস্টেম না থাকলে তা হারাম হবে ব্যাপারটা এমন নয়। এমন হলে ইজতিহাদ বলে কোনো শব্দের দরকার ছিলো না, স্কলারদের গবেষণা আর তাহলে কীসে হবে? মু’আমালাতের বা ট্রাঞ্জেকশনের মূল রুলিং হচ্ছে সব পদ্ধতি বা সিস্টেম হালাল, যদি না তা হারাম হয়। এখানে শরী’আহ টেক্সট দ্বারা হারাম প্রমাণিত হতে হবে।

মূল টপিক ইসলামিক ব্যাংকিং না। টপিক হচ্ছে সারপ্লাস ইউনিট থেকে ডেফিসিট ইউনিটে টাকা সরবরাহ করতে ব্যাংক কি লাগবেই? টাকা সরবরাহে কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা হলো টাকার সাথে সুদ যোগ করে দেওয়া, এটাই ব্যাংকের মূল আয়। ব্যাংক বলতে এখানে সুদী ব্যাংককে বুঝাচ্ছি। ব্যাংকের সাথে তাই দু’টি শব্দ জড়িত। এক হলো ঋণ আর আরেকটা সুদ। কারো ঋণ থাকলে রাসূল ﷺ তার জানাজা পড়াতেন না যদি না এই ঋণ পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা হয়। এমনকি শহীদদের বিষয়েও ঋণের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। এসব বিষয়ে প্রচুর হাদীস আছে। এসব হচ্ছে হালাল ঋণের কথা, যেটাতে সুদ থাকে না। তাই স্বভাবতই একজন মুসলিম এক্সট্রিম প্রয়োজন ছাড়া ঋণ নিবে না। এখানেই হচ্ছে পার্থক্য। পাশ্চাত্য ইকোনমি যেখানে সম্পূর্ণটাই ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আচ্ছা ঋণ যদি সোসাইটিতে এইরকম ব্যবহার না হয়, তবে কি সুদ থাকবে? উত্তর না! সুদ কী? যেই ঋণ কোনো বেনিফিট আনে, তা-ই সুদ। আমি আপনাকে ১০০ টাকা দিলাম। পরের দিন আপনি আমাকে এক কাপ চা খাওয়ালেন যা আগে আমার আপনার মধ্যে প্রচলিত ছিলো না। আমি আর আপনি সুদে জড়িয়ে গেলাম।

রাসূল ﷺ বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ ঋণ মঞ্জুর করে এবং ঋণগ্রহীতা তাকে একটি থালা দেয়, তার সেটা গ্রহণ করা উচিত নয় এবং ঋণগ্রহীতা যদি (ঋণদাতাকে) উটের ওপর চড়ার প্রস্তাব দেয়, তার চড়া উচিত নয় যদি না তারা (ঋণ নেয়ার) পূর্ব থেকেই এই রকম বিনিময়ে অভ্যস্ত থাকে।” (বায়হাকী, কিতাবাল বুয়ু, বা’ব কুল্লি কারদিন জাররা মান’ফাআতান ফা হুয়া রিবাহ)

তাই ঋণ দানের মাধ্যমে অর্থ সাপ্লাইয়ের সিস্টেমটা বাদ দিতে হবে। না হলে সুদ থেকে বের হওয়ার কোনো সিস্টেমই কাজে দিবে না। সত্যি কথা বলতে ক্রেডিট ফাইনান্সিং থেকে ইসলামিক ব্যাংকগুলোকে বের হতে হবে, টুডে অর টুমোরো। হ্যাঁ, কীভাবে বের হবে সেটা গবেষণার বিষয়।

একটা আইডিয়াল মুসলিম সোসাইটিতে, ক্রেডিট ফাইনান্সিংয়ের প্রয়োজনীয়তা এমনিতেই অনেক কমে যাবে। মানে ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা অনেক কমে যাবে, ক্রেডিট নাই তো ব্যাংক নাই। মূলত ব্যাংক যেই কাজটা করে (অর্থাৎ সারপ্লাস ইউনিট থেকে ডেফিসিট ইউনিটে অর্থ সাপ্লাই), এর জন্য ইসলামে কিছু ইনবিল্ট মেকানিজম আছে।

প্রথমটাই হলো যাকাত। এটা হলো বাধ্যতামূলক। এটা ভলান্টারি সাদাকাহ নয়, এটা কিছু মানুষের অধিকার। যাকাত সম্পর্কে প্রথম ভুল ধারণা হলো, এটা শুধু গরীবদের দেওয়া যায়। আসলে যাকাত মোট ৮ শ্রেণীর লোকদের দেওয়া যায়। আল কুর’আনে সূরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে এর লিস্ট দেয়া আছে। যাকাত কী করে? সম্পদ রিডিস্ট্রিবিউট করে দেয়। সারপ্লাস ইউনিট থেকে ডেফিসিট ইউনিটে অর্থ সরবরাহ হয়। আমাদের বর্তমান মুসলিম সোসাইটি কি যাকাতকে বাধ্যতামূলক মনে করে? উত্তর না। তারা মনে করে এটা অপশনাল। যাকাতের একটা দিক হলো এটা মানুষের মনকে, সম্পদকে পরিশুদ্ধ করে। আরেকটা দিক হলো, মানুষকে সম্পদ জমিয়ে না রেখে ইনভেস্ট করতে উৎসাহিত করে। কারণ জমিয়ে রাখা মানেই ঐ সম্পদের ওপর যাকাত দিতে হবে। সত্যি কথা বলতে ক্রেডিট ফাইনান্সিং আর গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণের বিপরীতে মুসলিম সোসাইটিতে যাকাত হচ্ছে একটা স্ট্রং অস্ত্র। সবাই যদি যাকাত দেয়, অটোমেটিক্যালিই ঋণের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।

সাদাকাহ হলো আরেকটি। আরো আছে ওয়াকফ, ইনহেরিটেন্স এর সুন্দর সিস্টেম এগুলো সবই ক্যাপিটালের সরবরাহ দেয়। ইসলামে আরেকটা সিস্টেম হলো কারদে হাসানা বা বিনোভোলেন্ট লোন, যা কারো জরুরী প্রয়োজনে দেওয়া হয়।

“তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ (কারদে হাসানা) দাও।” [সূরাহ আল-মুযযাম্মিল ৭৩:২০]

ইসলামিক সিস্টেমে পাবলিক সেক্টর, প্রাইভেট সেক্টর এর পাশাপাশি ভলান্টারি সেক্টর নামেও একটা সেক্টর আছে। যা সারপ্লাস ইউনিট থেকে ডেফিসিট ইউনিটে অর্থ সরবরাহ করে।

“তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, তারা কী ব্যয় করবে। বলে দাও-যে বস্তুই তোমরা ব্যয় কর, তা হবে পিতা-মাতার জন্যে, আত্মীয়-আপনজনের জন্যে, এতীম-অনাথদের জন্যে, অসহায়দের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। আর তোমরা যে কোনো সৎকাজ করবে, নিঃসন্দেহে তা অত্যন্ত ভালোভাবেই আল্লাহর জানা রয়েছে।” [সূরাহ আল-বাকারাহ ২:২১৫]

এই আয়াতে কী জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো? কোথায়, কীভাবে, কী ব্যয় করবে। কীভাবে ইনকাম করবে তা বলা হয়নি। আমি বলছি না যে, কুর’আনে কোথাও ইনকামের কথা বলা নাই। আমি বলতে চাইছি, হাশরের মাঠে কোথা থেকে ইনকাম করেছো তা যেমন জিজ্ঞেস করা হবে, কোথায় ব্যয় করেছো তাও বলা হবে। আপনি যদি বলেন আপনি সুদী ঋণ দিয়ে, বন্ড, কমার্শিয়াল পেপার কিনে ব্যয় করেছেন, তবে কিন্তু আপনার খবর আছে!

আরেকটা সিস্টেম হলো প্রফিট লস শেয়ারিং। আল্লাহ্‌ বলেছেন, “কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে দেশে-বিদেশে ভ্রমণ (ইয়াদরিবুনা) করবে” [সূরাহ আল-মুযযাম্মিল ৭৩:২০]। এখানে ভ্রমণ মানে ব্যবসায় করতে ভ্রমণ। প্রফিট লস শেয়ারিংয়ের দু’টো প্রধান পদ্ধতি হলো মুদারাবা, আরেক টা মুশারাকা। আমাদের কাছে টাকা থাকলে আমরা কী করি? ব্যাংকে জমা রাখি। কেন? আমাদের সোসাইটিতে অনেকেই আছে যারা টাকার অভাবে অনেক ভালো বিজনেস প্লান নিয়ে এগুতে পারছে না। আপনি তাকে টাকা দিন প্রফিট লস শেয়ারিং সিস্টেমে। আপনি কি দিবেন? না কেন? কারণ ট্রাস্ট, বিশ্বাসের অভাব। যেহেতু ট্রাস্ট নাই, সেহেতু প্রফিট লস শেয়ারিং ও নাই। যা আছে তা হলো ঋণ। এইবার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলো।

অনেক কথা বললাম। সব সামারাইজ করি। সুদ হচ্ছে ক্রেডিট ফাইনান্সিংয়ের অবধারিত ফল। সুদ থেকে সত্যিকার অর্থে মুক্তি পেতে হলে দরকার ক্রেডিট ফাইনান্সিং থেকে মুক্তি, ঋণ থেকে মুক্তি। এর জন্য দরকার আইডিয়াল মুসলিম সোসাইটি যারা যাকাত দিবে বাধ্যতামূলকভাবে, যারা আবু বকর (রাঃ), উসমান (রাঃ) এর মতো সাদকাহ করবে, যারা কারদে হাসানা দিবে, যারা ওয়াকফ করবে, যারা প্রফিট লস শেয়ারিংয়ে বিজনেস করবে। যারা শুধুমাত্র সম্পদ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় মত্ত থাকবে না। যাদের নিজের পকেটে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলেও ঘরে এয়ার কন্ডিশনিং করার জন্য লাখ টাকা ঋণ নিবে না। যারা সিম্পল লাইফ লিড করবে, অহেতুক খরচ করবে না। তাই একটা আইডিয়াল মুসলিম সোসাইটিতে আসলে ক্রেডিট ফাইনান্সিংয়ের তেমন দরকার পড়ে না, মানে ব্যাংকের রোল অনেক কমে যায়। আর যতদিন ক্রেডিট ফাইনান্সিং চলবে, আমরা ঠিক না হবো, ততোদিন সর্বোচ্চ বর্তমান ইসলামিক ব্যাংকিংয়ের মতো একটা বাইপাস সিস্টেমে চলতে হবে, সুদ থেকে বাঁচার জন্য, কিন্তু সুদ আর সমাজ থেকে নির্মূল হবে না।

 

ইসলামিক ব্যাংকিং ও ‘সন্দেহজনক’ বিষয়

আপনি ব্যাংকে গেলেন, কিছু কাগজপত্র সিগনেচার করলেন, এরপর টাকা পেয়ে গেলেন। ইসলামিক ব্যাংক হলে না হয় আগে পরে দু’একটা পেপার বেশি সই করা লাগে বা দু’একটা পেপার বেশি জমা দেওয়া লাগে, এ-ই যা! এরপর ব্যাংক থেকে বের হয়ে মনে মনে বললেন, এইটা কীসের ইসলামিক ব্যাংক! সব ভণ্ডামি! ইসলামের নাম ভাঙিয়ে খাওয়ার ধান্দা! এরপর জনগণের কাছে প্রচার করতে লাগলেন, সব ভণ্ডামি, পার্সেন্টেজ তো ঠিকই খায়! শুধু নামে ইসলামিক!

এই তো গেলো আমজনতা’র কথা। তবে যারা শুধু ‘নামে’ নয়, ‘কর্মে’ও মুসলিম, তাদের মধ্যেও বিশাল একটা অংশ মনে করে এবং ‘প্রচার’ করে দু’টোর মধ্যে কোনো ‘পার্থক্য’ নাই! বরং এমন অনেকেই আছেন, যারা ইসলামে ‘ইসলামিক ব্যাংকিং’ নেই মর্মে ফতোয়া দেন। এইসব ভাইদের জন্যেই এই লিখা, যারা তাকওয়াবান, মুত্তাকি, যারা চিন্তা করে।

কুরআনে সূরাহ বাকারাহ’র ২৭৫ নং আয়াতে কাফিরদের একটা উক্তির মধ্যে অনেক চিন্তা করার বিষয় আছে বৈকি। তারা বলেছিলো, ‘ব্যবসায় তো সুদের মতোই।’ বর্তমানে, বিশেষ করে এই দেশের ইসলামিক ব্যাংকিং প্র্যাক্টিসের সাথে সুদি ব্যাংকগুলোর অনেক সাদৃশ্য আছে! সাদৃশ্য স্বাভাবিক, দুটোই আর্থিক প্রতিষ্ঠান। কাফিররা কেন বলেছিলো যে, ব্যবসায় তো সুদেরই মতো?

নিশ্চয়ই সুদের সাথে ব্যবসায়ের একটা বাহ্যিক সাদৃশ্য আছে। সুদ ও ব্যবসায় উভয়ের সাথেই ‘আর্থিক’ বিষয় রিলেটেড এবং উভয়ের উদ্দেশ্যই ‘বৃদ্ধি’ করা। আল্লাহ্‌ কী বলেছেন এরপর? আল্লাহ্‌ কি বলেছেন যে, না ব্যবসায়ের সাথে সুদের কোনো ন্যূনতম সাদৃশ্য নেই? আল্লাহ্‌ বলেছেন,

আল্লাহ্‌ ব্যবসায়কে হালাল করেছেন, কিন্তু সুদকে করেছেন হারাম। [সূরাহ আল-বাকারাহ (২):২৭৫]

ব্যবসায় হালাল মানে সকল ব্যবসায়ই হালাল। তা বাকিতে বিক্রয় হোক, বাকিতে বিক্রয়ে মূল্য বৃদ্ধি করে হোক বা মূল্য কমিয়ে হোক! এই আয়াতটি হচ্ছে ‘আম’ বা জেনারেল, যেখানে সকল ব্যবসায়ের মোড (ধরন)-কে হালাল করা হয়েছে। এখন কেউ যদি বলে “না, অমুক টাইপ ব্যবসায় হারাম,” তবে তাকে প্রমাণ দিতে হবে।

যেমন, রাসূল ﷺ ইনা’ ব্যসাকে নিষিদ্ধ করেছেন। এই বিষয়ে হাদীস আছে। সুতরাং ইনা’ ব্যবসায় হারাম সাব্যস্ত হলো। (মুরাবাহ ও টাইম ভ্যালু নিয়ে আমার একটা লিখা আছে, আগ্রহীগণ পড়তে পারেন। ইনশা আল্লাহ আপনার জন্য চিন্তার দরজা খুলবে। )

অনেকেই ইসলামিক ব্যাংকিংকে ‘সন্দেহজনক বিষয়’এ ফেলে থাকেন। অবশ্যই তাকওয়ার দাবী এটাই যে, মুমিনরা ‘সন্দেহজনক’ বিষয় থেকে দূরে থাকবে! এই পৃথিবীকে দয়াময় আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য এতটা ছোট করে ফেলেননি যে, আমাদের সন্দেহজনক বিষয়ের ওপর নির্ভর করতেই হবে! আপনি যদি মনে করেন আপনার কাছে যতটুকু ইনফরমেশন আছে, আপনি ইসলামিক ব্যাংকিং নিয়ে যা জানেন তাতে মনে হচ্ছে এটা সন্দেহজনক বিষয়, আপনার জন্য তো এটাই উত্তম যে আপনি ‘সন্দেহজনক’ বিষয় এড়িয়ে চলবেন যতক্ষণ না আপনার জন্য আল্লাহ্‌ বিষয়টা পরিষ্কার করে দেন! কিন্তু আপনি যখন কোনো বিষয়কে সন্দেহজনক বলে ‘প্রচার’ করবেন, তখন ব্যপারটা ভিন্ন! তাকওয়ার দাবী তো এটাই যে, আমরা যা জানি না তাতে চুপ থাকবো। যারা জানে, তাদের জিজ্ঞেস করবো।

দেখুন ভাইয়েরা, ইসলামিক ব্যাংকিং কোনো আক্বীদাহর বিষয় নয় যে, আমি আপনাকে কুরআন বা সুন্নাহ থেকে আয়াত বের করে দেখিয়ে দিতে পারবো যে এই দেখেন আল্লাহ্‌ নাযিল করেছেন ‘ইসলামিক ব্যাংকিং হালাল’। কিন্তু আল্লাহ্‌ যেই বিষয়কে হারাম করেননি, তাকে আমরা তো হারাম বলতে পারি না! অবশ্যই এটা আল্লাহ’র প্রতি মিথ্যা আরোপ করা। দেখুন, যতসব বিচারক জাহান্নামে যাবে তাদের মধ্যে তো একদল থাকবে যারা বিচার করতো সঠিক ইলম ছাড়া, নলেজ ছাড়া। এইবার হোক তাদের বিচারের ফলাফল সঠিক অথবা ভুল। সত্যি কথা বলতে, আমি এমন কাউকে দেখিনি যিনি ইসলামিক ব্যাংকিং এর বিষয়ে ফরমাল অথবা ইনফরমাল কোনো এজুকেশন নিয়ে তারপর বিরোধিতা করেন! দেখুন, আপনি দু’একটা বই পড়ে যদি এই বিষয়ের বিরুদ্ধে বলতে যান, তবে নিশ্চয়ই এখানে আপনি ‘জাস্টিস’ করেননি।

ইসলামিক ব্যাংকগুলো বিভিন্ন টাইপের কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে ফাইনান্সিং এর জন্য। এইসব কন্ট্রাক্ট এর বিস্তারিত জুরিস্টরা (ফকিহ) তাঁদের জুরিসপ্রুডেন্সের বইগুলোতে আলোচনা করেছেন বহু শতাব্দী আগে। বর্তমান ইসলামিক ব্যাংকগুলো এর মডিফাইড ভার্শন ব্যবহার করে যেগুলো’র বিষয়ে অনেক রিসার্চ আছে। কথা আছে, আফটার অল এগুলো অ্যাকাডেমিক ডিসকাশনের বিষয়, যেখানে স্কলাররা ইজতিহাদ করেছেন যাদের নলেজ আছে। আপনার যদি কোনো একটা মত ভালো না লাগে, তা খুবই স্বাভাবিক। এই দেশের অনেক ইসলামিক ব্যাংকের প্র্যাক্টিস নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কথা হতে পারে, অ্যাকাডেমিক ডিসকাশন হতে পারে। কিন্তু এক কথায় ‘ইসলামিক ব্যাংকিং’কে হারাম বলে দেওয়া, ‘সন্দেহের লিস্টে’ ঢুকিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে, জাস্টিস হবে? যেখানে অনেক স্কলাররা এসব নিয়ে গবেষণা করছেন, যেখানে মুসলিমরা চেষ্টা করছে সুদী সিস্টেমের বিপক্ষে একটা সিস্টেম দাঁড় করাতে?

ব্যক্তিগত পর্যায়ে হয়তোবা ব্যাংক ছাড়া কেউ তার লাইফ পার করে দিতে পারবে, এটা অসম্ভব না। তবে গ্রসভাবে এটা অনেক কঠিন। আমি অনেক দ্বীনি ভাইকে চিনি, যারা ব্যবসায় করতে সমস্যায় পড়েছেন ‘ক্রেডিট কার্ড’ এর জন্য। এইখানে ইসলামিক ব্যাংকগুলো একটা ‘অপশন’ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কারো ব্যাংক ছাড়া চলা এখন অনেকটাই অসম্ভব। বাস্তব বিশ্ব থেকে সরে গিয়ে চিন্তা করা কি উচিত হবে! যেখানে আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য দ্বীনকে সহজ করতে চেয়েছেন? অবশ্যই আল্লাহ্‌ তো এটা পছন্দ করেন না যে, যেখানে তিনি সহজ করেছেন আমরা তা কঠিন করি?

আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের কষ্ট দিতে চান না। [সূরাহ আল-বাকারাহ (২):১৮৫]

সবশেষে, কিছু কথা চিন্তার জন্য যথেষ্ট হবে ইনশা আল্লাহ! তা হলো, ইসলামিক ব্যাংকিং কোনো স্ট্যাটিক বিষয় না, এটা ডাইনামিক বিষয়। ব্যাপারটা এমন না যে, এখন ইসলামিক ব্যাংকগুলো যা প্র্যাক্টিস করছে, তা-ই সারাজীবন প্র্যাক্টিস করতে হবে। বরং এই বিষয়ে যত বেশি ডিসকাশন হবে, রিসার্চ হবে এবং সর্বোপরি যোগ্য লোক এই সেক্টরে আসবে, ততই ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরের উন্নতি হবে, এবং সর্বোপরি সুদী সিস্টেম এর বিপরীতে একটা স্ট্রং সিস্টেম দাঁড় করানো যাবে।

 

আইডিসির সাথে যোগ দিয়ে উভয় জাহানের জন্য ভালো কিছু করুন।

 

আইডিসি এবং আইডিসি ফাউন্ডেশনের ব্যপারে বিস্তারিত জানতে  লিংক০১ ও লিংক০২ ভিজিট করুন।

আইডিসি  মাদরাসার ব্যপারে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। 

আপনি আইডিসি  মাদরাসার একজন স্থায়ী সদস্য /পার্টনার হতে চাইলে এই লিংক দেখুন.

আইডিসি এতীমখানা ও গোরাবা ফান্ডে দান করে  দুনিয়া এবং আখিরাতে সফলতা অর্জন করুন।

কুরআন হাদিসের আলোকে বিভিন্ন কঠিন রোগের চিকিৎসা করাতেআইডিসি ‘র সাথে যোগাযোগ করুন।

ইসলামিক বিষয়ে জানতে এবং জানাতে এই গ্রুপে জয়েন করুন।

Islami Dawah Center Cover photo

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টারকে সচল রাখতে সাহায্য করুন!

 

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টার ১টি অলাভজনক দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান, এই প্রতিষ্ঠানের ইসলামিক ব্লগটি বর্তমানে ২০,০০০+ মানুষ প্রতিমাসে পড়ে, দিন দিন আরো অনেক বেশি বেড়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

বর্তমানে মাদরাসা এবং ব্লগ প্রজেক্টের বিভিন্ন খাতে (ওয়েবসাইট হোস্টিং, CDN,কনটেন্ট রাইটিং, প্রুফ রিডিং, ব্লগ পোস্টিং, ডিজাইন এবং মার্কেটিং) মাসে গড়ে ৫০,০০০+ টাকা খরচ হয়, যা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সেকারনে, এই বিশাল ধর্মীয় কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে আপনাদের দোয়া এবং আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন, এমন কিছু ভাই ও বোন ( ৩১৩ জন ) দরকার, যারা আইডিসিকে নির্দিষ্ট অংকের সাহায্য করবেন, তাহলে এই পথ চলা অনেক সহজ হয়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

যারা এককালিন, মাসিক অথবা বাৎসরিক সাহায্য করবেন, তারা আইডিসির মুল টিমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন, ইংশাআল্লাহ।

আইডিসির ঠিকানাঃ খঃ ৬৫/৫, শাহজাদপুর, গুলশান, ঢাকা -১২১২, মোবাইলঃ +88 01609 820 094, +88 01716 988 953 ( নগদ/বিকাশ পার্সোনাল )

ইমেলঃ info@islamidawahcenter.com, info@idcmadrasah.com, ওয়েব: www.islamidawahcenter.com, www.idcmadrasah.com সার্বিক তত্ত্বাবধানেঃ হাঃ মুফতি মাহবুব ওসমানী ( এম. এ. ইন ইংলিশ, ফার্স্ট ক্লাস )