তিনটি ঘটনা এবং একটি সত্যের সাক্ষ্য

মুহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান মিনার

ঘটনা 

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) চাচা আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব ছিলেন বেশ ধনী মানুষ। ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত বদর যুদ্ধে তিনি মক্কার মুশরিক কুরাঈশ সৈন্যদলের সাথে ছিলেন। মক্কা থেকে রওনা হবার আগে গভীর রাতে খুব গোপনে বেশ কিছু সম্পদ স্ত্রীর কাছে লুকিয়ে রেখে যান। মক্কা থেকে তিনি যখন বদর যুদ্ধে যাত্রা করেন, তখন কাফির কুরাঈশ সৈন্যদের জন্য ব্যয় করার উদ্দেশ্যে বিশ উকিয়া (স্বর্ণমুদ্রা) সাথে নিয়ে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো ব্যয় করার আগেই তিনি গ্রেফতার হয়ে যান। এ যুদ্ধে পরাজিত মক্কার কুরাঈশদের অনেকেই মুসলিমদের হাতে বন্দী হয়েছিলো। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ নিয়ে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিলো।

যখন মুক্তিপণ দেওয়ার সময় আসে, তখন তিনি রাসূলকে (সাঃ) বললেন, “আমি তো মুসলিম ছিলাম!”

IIRT Arabic Intensive

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “আপনার ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। যদি আপনার কথা সত্য হয়, তবে আল্লাহ আপনাকে এর প্রতিফল দেবেন। আমরা তো শুধু প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের উপর হুকুম দেবো। সুতরাং, আপনি আপনার নিজের এবং দুই ভাতিজা আকিল ইবন আবি তালিব ও নওফেল ইবন হারিসের মুক্তিপণও পরিশোধ করবেন।”

আব্বাস আবেদন করলেন, “আমার এত টাকা কোত্থেকে [আসবে]?”

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “কেন? আপনার নিকট কি সে সম্পদগুলো নেই, যা আপনি মক্কা থেকে রওয়ানা হওয়ার সময়ে আপনার স্ত্রী উম্মুল ফযলের নিকট রেখে এসেছেন এবং বলেছিলেন[১], ‘আমি যদি এ যুদ্ধে মারা যাই, তাহলে এ মাল ফযল আবদুল্লাহ ও কুছামের সন্তানরদেরকে দিও’?”

আব্বাস বললেন, “আপনি সে কথা কেমন করে জানলেন?! আমি যে রাত্রের অন্ধকারে একান্ত গোপনে সেগুলো আমার স্ত্রীর কাছে দিয়েছিলাম এবং এ ব্যাপারে তৃতীয় কোনো লোক জানতো না!”

রাসূল (সাঃ) বললেন, “সে ব্যাপারে আমার রব আমাকে বিস্তারিত অবহিত করেছেন।”[২]

আব্বাস বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি নিশ্চিত হয়েছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল! কারণ, এই লুকানো সম্পদের কথা আমি আর উম্মুল ফযল ছাড়া আর কেউই জানতো না।”[৩]

তিনি শাহাদাহ পাঠ করলেন, ইসলামে দাখিল হলেন। রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা ‘আনহু।

 

ঘটনা 

খাইবারের দুর্গ বিজয়ের পর এক ইহুদি মহিলা বকরীর মাংসে বিষ মিশিয়ে রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) মেরে ফেলার চেষ্টা করলো। একজন সাহাবী মারাও গেলেন।[৪] এর কিছুক্ষণ পরের ঘটনা।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “এখানে যত ইহুদি আছে, আমার কাছে তাদের একত্রিত কর।”

তাঁর কাছে সকলকে একত্র করা হলো।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “আমি তোমাদের কাছে একটা ব্যাপারে জানতে চাই, তোমরা কি সে বিষয়ে আমাকে সত্য কথা বলবে?”

তারা বললো, “হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম।” [মুহাম্মাদের (সাঃ) উপনাম]

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “তোমাদের পিতা কে?”

তারা বললো, “আমাদের পিতা অমুক…”

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “তোমরা মিথ্যে বলেছো; বরং তোমাদের পিতা অমুক। [তিনি তাদের সত্যিকার বাবার নাম বলে দিলেন]”

তারা বললো, “আপনি সত্য বলেছেন ও সঠিক বলেছেন।”

এরপর তিনি বললেন, “আমি যদি তোমাদের নিকট আর একটি প্রশ্ন করি, তাহলে কি তোমরা সেক্ষেত্রে আমাকে সত্য কথা বলবে?”

তারা বললো, “হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম! যদি আমরা মিথ্যে বলি, তবে তো আপনি আমাদের মিথ্যা জেনে ফেলবেন, যেমনিভাবে জেনেছেন আমাদের পিতার ব্যাপারে।” …[৫]

যারা খাবারে বিষ মিশিয়ে তাঁকে মেরে ফেলতে চাইলো, তাদের কাছে এভাবে তিনি নিজ নবুয়তের সত্যতার একটা চিহ্ন দেখিয়ে গেলেন। সঠিকভাবে তাদের বাবার নাম বলে দিয়ে আসলেন।[৬] তারাও দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করে নিলো যে, তারা মিথ্যা বলার পরেও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সঠিকভাবে তাদের বাবার নাম বলে দিয়েছেন। এবং তারা এরপর মিথ্যা বললে সেটাও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ধরে ফেলবেন।

ঘটনা 

মক্কা বিজয় হয়ে যাবার পরের ঘটনা। মক্কা বিজয় করে মুসলিমগণ নগরে প্রবেশ করার পর যখন রাতের আগমন হলো, তখন রাতভর তাঁরা তাকবির ধ্বনি ও কালিমার আওয়াজে চারিদিক মুখরিত করে রাখলেন। এভাবে সকাল হয়ে গেলো।

তখন আবু সুফিয়ান স্ত্রী হিন্দকে ডেকে বললেন, “দেখো না, এ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে হচ্ছে।”

হিন্দ বললো, “হ্যাঁ, এ আল্লাহর পক্ষ থেকেই।”

কুরাঈশদের নেতা আবু সুফিয়ান ও তাঁর স্ত্রী হিন্দ সবসময়েই ইসলামের বিরোধিতা করে আসতেন। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে শত্রুতা পোষণ করে করে তাঁরা এতদিন অনেক কিছুই করে এসেছেন।

এরপর আবু সুফিয়ান খুব সকালে উঠে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট গিয়ে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “তুমি হিন্দকে বলেছিলে, ‘দেখো না, এ সব আল্লাহর পক্ষ থেকে হচ্ছে।’ আর হিন্দ বলেছিলো, ‘হ্যাঁ, এ আল্লাহর পক্ষ থেকে।’”

তখন আবু সুফিয়ান বললেন, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। সেই আল্লাহর কসম, যার নামে কসম খাওয়া হয় — আমার এ কথা হিন্দ ব্যতিত অন্য কোনো ব্যক্তি শোনেনি!”[৭]

অনলাইন জগতে মুহাম্মাদের (সাঃ) নবুয়তকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অনেক কিছুই ইদানীং লেখা হচ্ছে। নাস্তিক-মুক্তমনা ও খ্রিষ্টান মিশনারিরা কুরআন, হাদীস, সীরাহ এসব সূত্র থেকেই বিভিন্ন ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ধৃত করে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে — মুহাম্মাদ (সাঃ) কোনো নবী ছিলেন না, বরং তিনি জোর জুলুম করে আরব দেশে একটা নতুন মতবাদ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন! (না’উযুবিল্লাহ) তিনি নাকি তাঁর নবুয়তের কোনো নিদর্শন (signs) বা প্রমাণ দেখিয়ে যাননি। (না’উযুবিল্লাহ) তারা এত সীরাহ অধ্যয়ন করে, উপরের ঘটনাগুলোর একটিও কি তাদের চোখে পড়েনি? গায়েবের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহই রাখেন, আর তিনি তাঁর নবীদের নিকট ওয়াহীর দ্বারা সংবাদ প্রেরণ করেন।[৮]

মুহাম্মাদ (সাঃ) যদি আল্লাহর নবী না-ই হয়ে থাকতেন, তাহলে তিনি কী করে উপরের ৩টি ঘটনায় গোপন সংবাদগুলো বলে দিলেন? কোনো ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ চেতনা বা অন্য কোনো চেতনা দিয়ে কি এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে? যে সূত্রগুলো (হাদীস ও সীরাত গ্রন্থ) ব্যবহার করে নাস্তিক-মুক্তমনা ও খ্রিষ্টান মিশনারিরা মুহাম্মাদের (সাঃ) নবুয়তকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়, সে সূত্রগুলো থেকেই তো এ ঘটনাগুলো নেয়া। তারা যদি এ ঘটনাগুলো অবিশ্বাস করে বা অগ্রহণযোগ্য বলে, তাহলে আমরা তাদেরকে বলবো, ‘‘তাহলে আপনারা কোন মুখে ইসলামকে মিথ্যা প্রমাণের জন্য হাদীস ও সীরাত থেকে কোট করেন? ঐ কাজগুলোও তাহলে বন্ধ করুন। সরাসরি বলে দিন, ‘আমরা কোনো ইতিহাস বিশ্বাস করি না!’ এত ডাবল স্ট্যান্ডার্ড কেন আপনাদের?’’

উপরের ৩টি ঘটনার মতো আরো বহু ঘটনা ছড়িয়ে আছে হাদীস ও সীরাত গ্রন্থগুলোতে। সবগুলো একত্র করলে একটি বই হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। উপরের ঘটনাগুলো একটি মহাসত্যেরই সাক্ষ্য দেয় — মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল।

এগুলো অদৃশ্যের সংবাদ, যা আমি তোমার [মুহাম্মাদ (সাঃ)] কাছে ওয়াহী মারফত পৌঁছে দিচ্ছি। ইতিপূর্বে এটা না তুমি জানতে, আর না তোমার জাতি। অতএব তুমি ধৈর্য ধারণ কর; নিশ্চয়ই শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্যই। [সূরাহ হূদ (১১):৪৯]

তিনি [আল্লাহ] অদৃশ্যের জ্ঞানী, আর তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারো কাছে প্রকাশ করেন না। তবে তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া। আর তিনি তখন তার সামনে ও তার পিছনে প্রহরী নিযুক্ত করেন। যাতে তিনি এটা জানতে পারেন যে, তারা তাদের রবের রিসালাত পৌঁছিয়েছে কি না। আর তাদের কাছে যা রয়েছে, তা তিনি পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি প্রতিটি বস্তু গুণে গুণে হিসাব করে রেখেছেন। [সূরাহ আল-জিন (৭২): ২৬-২৮]

 

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থাবলীঃ

 

[১] এ অংশটুকু ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে আছে

[২] কুরআনুল কারীম (বাংলা অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত তাফসির), ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, ১ম খণ্ড, সূরাহ আল-আনফালের ৭০ নং আয়াতের তাফসীর, পৃষ্ঠা ৯২৮-৯২৯

[৩]  ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ – ইবন কাসির(র.) (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২২

[৪] সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ৩৫০ দ্রষ্টব্য

[৫] সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ৫৭৭৭

[৬] সঠিকভাবে এতগুলো লোকের বাবার নাম বলে দেওয়া কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়। সে যুগে জন্ম নিবন্ধন হতো না, কোনো ডেটাবেইসও ছিলো না।

[৭] ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ – ইবন কাসির(র.) (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২২

[৮] “No one knows the unseen in the absolute sense except Allaah” — islamQa (Shaykh Muhammad Saalih al-Munajjid)

আইডিসির সাথে যোগ দিয়ে উভয় জাহানের জন্য ভালো কিছু করুন!

আইডিসি এবং আইডিসি ফাউন্ডেশনের ব্যপারে  জানতে  লিংক০১ ও লিংক০২ ভিজিট করুন।

আইডিসি  মাদরাসার ব্যপারে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। 

আপনি আইডিসি  মাদরাসার একজন স্থায়ী সদস্য /পার্টনার হতে চাইলে এই লিংক দেখুন.

আইডিসি এতীমখানা ও গোরাবা ফান্ডে দান করে  দুনিয়া এবং আখিরাতে সফলতা অর্জন করুন।

কুরআন হাদিসের আলোকে বিভিন্ন কঠিন রোগের চিকিৎসা করাতেআইডিসি ‘র সাথে যোগাযোগ করুন।

ইসলামিক বিষয়ে জানতে এবং জানাতে এই গ্রুপে জয়েন করুন।

 

Islami Dawah Center Cover photo

 

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টারকে সচল রাখতে সাহায্য করুন!

 

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টার ১টি অলাভজনক দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান, এই প্রতিষ্ঠানের ইসলামিক ব্লগটি বর্তমানে ২০,০০০+ মানুষ প্রতিমাসে পড়ে, দিন দিন আরো অনেক বেশি বেড়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

বর্তমানে মাদরাসা এবং ব্লগ প্রজেক্টের বিভিন্ন খাতে (ওয়েবসাইট হোস্টিং, CDN,কনটেন্ট রাইটিং, প্রুফ রিডিং, ব্লগ পোস্টিং, ডিজাইন এবং মার্কেটিং) মাসে গড়ে ৫০,০০০+ টাকা খরচ হয়, যা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সেকারনে, এই বিশাল ধর্মীয় কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে আপনাদের দোয়া এবং আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন, এমন কিছু ভাই ও বোন ( ৩১৩ জন ) দরকার, যারা আইডিসিকে নির্দিষ্ট অংকের সাহায্য করবেন, তাহলে এই পথ চলা অনেক সহজ হয়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

যারা এককালিন, মাসিক অথবা বাৎসরিক সাহায্য করবেন, তারা আইডিসির মুল টিমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন, ইংশাআল্লাহ।

আইডিসির ঠিকানাঃ খঃ ৬৫/৫, শাহজাদপুর, গুলশান, ঢাকা -১২১২, মোবাইলঃ +88 01609 820 094, +88 01716 988 953 ( নগদ/বিকাশ পার্সোনাল )

ইমেলঃ info@islamidawahcenter.com, info@idcmadrasah.com, ওয়েব: www.islamidawahcenter.com, www.idcmadrasah.com সার্বিক তত্ত্বাবধানেঃ হাঃ মুফতি মাহবুব ওসমানী ( এম. এ. ইন ইংলিশ )