মুসলিম বিশ্বের রূপায়ন (১)

 

১৯১৪ সালে থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে আমরা খুব একটা অবগত নই। আমরা আজকের যে মুসলিম বিশ্বকে দেখছি সেটা মূলত সেই ঘটনাগুলোরই দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র একটা প্রভাব। অটোম্যান খিলাফতের ভাঙনের পর থেকে ফিলিস্তিন দখল অতঃপর আজকের এই পরিণতি। মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থার কারণ সম্পর্কে বুঝতে হলে, আমাদেরকে ইতিহাসের কিছু নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে জানতে হবে।

IIRT Arabic Intensive

পটভূমি

১৯১৪ এর দিকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই, ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিশ্বের অধিকাংশ দেশকে শাসন করেছে। পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। আমেরিকা তখনও বিশ্বশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। অন্যান্য শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে জার্মান সাম্রাজ্য, অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য, রাশিয়ান সাম্রাজ্য আর ছিলো অটোম্যান খিলাফত। মুসলিম বিশ্বের মাঝে হয়তো কিছু মিল-অমিল ছিল এবং শক্তিমত্তায় তারা প্রথম জামানার মতো ছিলো না। কিন্তু এরপরেও একটা একতাবদ্ধ খিলাফত শাসন ছিল। তখনও মুসলিম উম্মাহ একত্রিত ছিল আর ছিল প্রজ্জ্বলিত আশার আলো।

যাই হোক, ১৯১৪ সালের জুন মাসের ২৮ তারিখে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় শাসনের উত্তরাধিকার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দকে গুপ্তহত্যার ফলে ‘সব যুদ্ধ শেষ করার যুদ্ধ’ এবং ভাঙ্গন শুরু হয়ে যায়। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ মহাশক্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। সারায়েভোর একদল সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদীদের হাতে আর্চডিউক খুন হন। সাথে সাথে জাতীয়তাবাদী আর জাতিগত উত্তেজনা যা কয়েক দশক ধরে দাবিয়ে রাখা হয়েছিল তা জ্বলে উঠলো। ফলশ্রুতিতে সার্বিয়াকে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়রা সবকিছুর সমাধান করে বিচার করার সময়সীমা বেঁধে দেয়।

অবশেষে সার্বিয়া তাদের চুক্তি পূর্ণাঙ্গ রূপে মেনে না নেওয়ায় অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়রা আক্রমণ করে বসে। রাশিয়ানরা তাদের মিত্রপক্ষের প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দেয়। প্রকৃতপক্ষে ঐ সময়ে ইউরোপীয় মিত্রপক্ষরা ছিলো খুব সুকৌশলী এবং যুদ্ধে নাক গলানো তখন কোনো ব্যাপারই ছিলো না। শীঘ্রই অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়দের মিত্রপক্ষ হিসেবে জার্মানি এতে জড়িয়ে গেলো। তারা এই যুদ্ধকে ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ড ইত্যাদি বেশ কিছু প্রতিবেশি দেশগুলোতে আক্রমণ করার বাহানা হিসেবে ব্যবহার করলো।

অবধারিতভাবে এই যুদ্ধে ধীরে ধীরে প্রত্যেক ইউরোপীয় এবং অন্যান্য বিশ্বশক্তিরা তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ করা শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত মিত্রশক্তি বনাম অক্ষশক্তির আবির্ভাব হলো।  রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইটালি এবং যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তি হিসেবে আর অক্ষশক্তি হিসেবে থাকলো জার্মানি, অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়া, বুলগেরিয়া এবং অটোম্যান  অর্থাৎ মুসলিমরা।

মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে ছোটখাট কিছু খন্ডযুদ্ধ হলেও ‘মহাযুদ্ধ’ এবং পরবর্তীতে যা ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে তা প্রকৃতপক্ষে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সংঘটিত হয় কারণ ইস্যু ছিলই মূলত ইউরোপকেন্দ্রিক ।

অটোম্যানদের সম্পৃক্ততা

সুলতান পঞ্চম মেহমেদ ১৯০৯ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত অটোম্যান সাম্রাজ্য শাসন করেন। যদিও এই সাম্রাজ্য বেশিরভাগ আরব দেশকেই শাসন করত তারপরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের পতন শুরু হয়ে গিয়েছিলো। বলা হতো, গত ১০০-১৫০ বছরে এই সালতানাত নামে মাত্র অবস্থান করছে। মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সাম্রাজ্যটি বসনিয়া ও আলবেনিয়ার উপর থেকে ক্ষমতা হারায়। অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। ঠিক একই সময়ে, ইউরোপীয়রা তাদের সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশকে উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করেছে।

খুব ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, পূর্বের মুসলিম সভ্যতার সাথে বর্তমান মুসলিম বিশ্বের মুসলিমদের একটা ব্যাপারে বেশ মিল ছিলো। আর সেটা হলো প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য অন্যদের প্রতি নির্ভরশীলতা। ইংরেজরা ১৮০০ সালের দিকে প্রচুর পরিমাণে এই ধরণের সহায়তা করে। ১৮৮০ সালের দিকে জার্মানির সাথে তুরস্কের চুক্তি স্থাপনের দরুন এই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ১৮৮৯ সালের জার্মানি-তুরস্কের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনকারী  বিলাসবহুল ‘ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’ এই মজবুত সম্পর্কের প্রতীক ।

যুদ্ধ যখন দাবানলের মতোন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন সুলতান এটাকে শুধু ইউরোপীয়দের মধ্যকার বিষয় হিসেবেই দেখার ব্যাপারে অবস্থান নিয়েছিলেন। এভাবে তিনি নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেন। তবে নির্দিষ্ট কিছু দল ও ধর্মনিরপেক্ষ-জাতীয়তাবাদী আন্দোলন  ‘ইয়াং তুর্কী’  এবং একই সাথে প্রধান উজীর সা’ঈদ হালিম পাশা এবং যুদ্ধমন্ত্রী এনভার পাশা আড়াল থেকে জার্মানদের সাথে একটি গোপন চুক্তি করার জন্য কাজ করছিলেন। ১৯১৪ সালের অগাস্ট মাসে যা ‘অটোম্যান-জার্মান মৈত্রী’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।

বলা হয়ে থাকে, ১৯১৪ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধমন্ত্রী এনভার পাশা কৃষ্ণসাগরে একটি রাশিয়া জাহাজকে আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেন। যার ফলস্বরূপ ৩ নভেম্বর রাশিয়া অটোম্যানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সও এতে অংশগ্রহণ করে। সুলতানের কাছে তখন চুক্তি অনুযায়ী অক্ষশক্তির সমর্থন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প উপায় ছিলোনা। তাই একজন খলিফা হিসেবে ১৪ নভেম্বর তিনি যুদ্ধের মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

১৯১৫ সালের শুরুতে অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স ‘গাল্লিপলি অভিযান’ পরিচালনা করা। বিখ্যাত রাজধানী কনস্টান্টিনোপলকে জয় করার উদ্দেশ্যে তারা যৌথভাবে আক্রমণ করে। দারদানালীস প্রণালী দখলের ব্যর্থ চেষ্টা থেকে শুরু করে ১৯১৫ সালের এপ্রিলে একটা দেশকে আক্রমণ করা পর্যন্ত পরিচালিত হয় গাল্লিপলি উপদ্বীপে। মিত্রশক্তি তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় এবং এই আক্রমণ তাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। আটমাস ব্যাপী এই যুদ্ধে ১৫০,০০০ ওপর যোদ্ধাকে হারিয়ে ১৯১৬ সালের জানুয়ারীতে মিত্রশক্তি ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়।

যুদ্ধটি অটোম্যানদের জন্যেও ভয়াবহ ছিলো। এতে ৬০,০০০ সৈন্য নিহত হয় এবং প্রায় ১০০,০০০ আহত হয়। যুদ্ধে এই বিজয়টি তাদের একমাত্র উল্লেখযোগ্য বিষয় হিসেবে গণ্য হয়েই শেষ হতে পারতো । কিন্তু এর তাৎপর্য ভবিষ্যৎ তুরস্কের জন্য কী হবে সেটা বুঝা যাচ্ছিলোনা। এই বিজয়ের সকল প্রশংসা কেবল একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিই কুড়াচ্ছিল । তিনি হলেন ইয়াং তুর্কির প্রাক্তন সদস্য এবং ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লবী এবং ইসলামির শাসনের অবসান অন্বেষণকারী মোস্তফা কামাল। যুদ্ধে তার অবদান ও জাতীয় অহংকারকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে তাকে নবনির্মিত তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি করা হয়।

যুদ্ধ ফেরত বিভিন্ন অটোম্যান দেশগুলো শীঘ্রই মিত্রশক্তির কাছে পরাজিত হতে থাকে। ১৯১৫ সালে, ইংরেজরা ইরাক আক্রমণ করে। ১৯১৭ সালের মার্চে তারা প্রাক্তন আব্বাসীয় রাজধানী বাগদাদ আক্রমণের জন্য অগ্রসর হয়। অটোম্যান পতাকা ছিনিয়ে নিয়ে ব্রিটিশ পতাকা উত্তলিত হয়। একই বছরের শেষের দিকে মিশরের (সেই সময়ে দেশটি ইংরেজদের সুরক্ষায় ছিলো) জেনারেল অ্যালেনবি গাজা এবং জাফফায় বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেন। সবশেষে তারা ৯ ডিসেম্বর জেরুজেলাম জয় করতে অগ্রসর হয়। শত শত বছর ধরে ‘পবিত্র নগরটিতে’ যে অটোম্যান শাসন বজায় ছিলো তার এখানেই ইতি হয়। এবং এভাবে অ্যালেনবি তার ‘ক্রিসমাস পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি’ পূরণ করেন।

বড় শহরগুলোর পতন অব্যাহত থাকে। ১৯১৮ সালের অক্টোবরে দামেস্ক এবং সবশেষে ১৩ নভেম্বর ইস্তানবুলের পতন হয়। জেরুজালেমসহ ইসলামি ইতিহাসের বিখ্যাত শহরগুলোর মধ্যে তিনটিই সেই সময়ে মিত্রশক্তির দখলে ছিলো। মুসলিম ইতিহাসে দেখা সর্বনিম্ন পর্যায়ে মুসলিম উম্মতগণ অবস্থান করছিলো।

যুদ্ধের তাৎক্ষনিক পরিণাম

মনুষ্যজাতির দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষের পরিণাম বুঝতে পেরে জার্মানি আত্মসমর্পণ করে। ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। ৭০ মিলিয়ন সৈন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং প্রায় ১০ মিলিয়ন যোদ্ধা এতে প্রাণ হারায়। প্রথমবারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যেমন বিমান বাহিনী এবং উন্নত ধরনের রাসায়নিক অস্ত্রকে এতোটা নিষ্ঠুরতার সাথে ব্যবহার করা হয়েছিল।

এই সংঘর্ষের পর পৃথিবীর চারটি বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। জার্মান সাম্রাজ্য, রাশিয়ান সাম্রাজ্য, অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় সাম্রাজ্য আর অটোম্যান সাম্রাজ্য। যেহেতু এই আলোচনার মুখ্য বিষয়বস্তু হচ্ছে অটোম্যান সাম্রাজ্য পতনের প্রভাব সম্পর্কিত। তাই আপাতত এখানে পশ্চিমা বিশ্ব সম্পর্কে তেমন কোনো গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।

স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র বিশ্ব জুড়ে মহাযুদ্ধের তীব্র একটা প্রভাব বিরাজ করছিলো।  দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পর কিছু কিছু ইউরোপিয় দেশে ২০% এর বেশি লোক মারা যায়। এভাবে আরও কয়েক মিলিয়ন লোকের মৃত্যু হয়। কিছু প্রতিবেদনের মতে, যুদ্ধ নিহত লোকের চেয়ে ৩ -৪ গুণ বেশি লোক এসময়ে মারা যায়। এতো কিছুর মধ্যে ১৯১৮ – ১৯২০ সালে বিশ্বব্যাপী ইনফ্লুয়েঞ্জা ছড়িয়ে পড়ে যা ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামে পরিচিত। ১৩২০ সালের ‘ব্ল্যাক ডেথ’ এর পরে এটাই ছিলো সবচেয়ে ভয়াবহ প্লেগ। ধারণা করা হয়, সমগ্র পৃথিবীর ৫% জনগণ অর্থাৎ ১০০ মিলিয়ন লোক এসময়ে মারা যায়।

এই সবকিছুর মিলিত কারণের অবশ্যম্ভাবী ফলাফল বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ভয়াবহ ধ্বস, কর্মক্ষেত্রে লোকবলের অভাব। বৃহৎভাবে সমাজ সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো এবং পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম পুরুষ-নারীর ভূমিকা সম্পর্কে নতুনভাবে জানার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিলো। কর্মক্ষেত্রগুলোতে জনবলের ঘাটতি পূরণ করতে মহিলাদের অংশগ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছিলো। প্রথমবারের মতো অধিকাংশ ঘরের পবিত্রতা বিসর্জিত হচ্ছিলো।

উল্লেখযোগ্য যে, ১৯১৮ সালে ‘ফার্স্ট-ওয়েভ ফেমিনিজম’ এর শেষের দিকেও পশ্চিমা বিশ্বে নারী বৈষম্য চরম আকারে ছিলো। ত্রিশ বছরের বেশি বয়সের নারীদের ভোট দেয়ার অধিকার ও নারীদের সম্পদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সফলভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করাকে এক বিরাট বিজয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি পাশ্চাত্যের নারীদের পুরুষদের ন্যায় ভোটের সমঅধিকার (অন্যান্য অধিকারের সাথে) প্রয়োগ করার কিছু সময় আগের ঘটনা । ১৯১৮ সালের শুরুরভাগ ছিলো ব্যাপকভাবে নারীদের কর্মক্ষেত্রে যোগদান নারীবাদী আন্দোলনের জন্য সন্ধিক্ষণ।

 

মুসলিম বিশ্বের রূপায়ন (২)

 

নভেম্বর ১৯১৮, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে বিজয়ী মিত্র বাহিনীগুলো আলোচনার জন্য সমবেত হল। উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত ‘শান্তির’ সংজ্ঞা দেয়া আর যুদ্ধে পাওয়া সম্পদের ভাগাভাগি। প্যারিসের এই সম্মেলন ‘প্যারিস শান্তি আলোচনা ১৯১৯’ নামে পরিচিত যা পুরো বছর জুড়ে স্থায়ী হয়েছিল। সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন সেখানে। তারা ব্যাবসা বাণিজ্যের সুযোগ, স্বাধীনতা, প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা, আবেদন-নিবেদন আর দর-কষাকষি করেছিলেন।

IIRT Arabic Intensive

পাঁচটি মুখ্য চুক্তি করা হয়েছিল, যার সবকটি চুক্তিই ছিল পরাজিত শক্তিগুলির সাথে। তখন বিশ্বে-শান্তি রক্ষার উদ্দেশ্যে ‘লীগ অফ ন্যাশন্‌স’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা ‘ইউনাইটেড ন্যাশন’ বা জাতিসংঘ হিসেবে রুপান্তরিত হয়।  এই চুক্তিগুলোর মধ্যে মূল যে চুক্তিটি পশ্চিমা বিশ্বের উপর  প্রভাব ফেলেছিল সেটি হচ্ছে ‘ভার্সাই চুক্তি।’ এর আলোচ্য বিষয় ছিল, জার্মানির উপর কি পরিমাণে ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হবে তার বিস্তারিত। বিশেষ করে ১৩২ বিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রার সমপরিমাণ আকাশচুম্বী এক ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হয়েছিল (তখন এর পরিমাণ ছিল ৩৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার)।

কিছু বছর পরে হিটলারের উত্থান নিয়ে অনেকেই যুক্তি দেখিয়েছেন যে জার্মানির উপর আরোপিত অত্যন্ত কঠোর শর্তাবলী তার ক্ষমতা গ্রহণে ইন্ধন যুগিয়েছিল। হীনমন্য জার্মানদের মাঝে সে আবির্ভূত হয়েছিল একজন ত্রাণকর্তা রূপে, যে-ই পারবে জার্মানদের হারানো গৌরব আর প্রতাপ ফিরিয়ে আনতে। যা অবশেষে বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অগ্নিমুখে, ইউরোপকে ধ্বংস করেছিল এবং আমেরিকাকে উন্নীত করেছিল পরাশক্তিতে।

ম্যাকমাহন চুক্তি এবং আরব বিদ্রোহ

অটোমান সম্রাজ্য এবং মুসলিম ভূমিগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যায়, ‘আরবের লরেন্স’ নামে পরিচিত টি.ই. লরেন্সের ভূমিকা হতে পারত উপকারী কিছুর সূচনা। সে ছিল তরুণ ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার, ঘাঁটি গেড়েছিল মিশরে। অটোমানদের পরাজিত করা যুদ্ধের সময় জেনারেল অ্যালেনবাই এর সান্নিধ্যে কাজ করেছিল এবং আরব ভূমিগুলোর নিয়ন্ত্রন গ্রহণ করেছিল।

লরেন্স আরবি ভাষায় খুব দক্ষ ছিল। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে সে প্রতিমাসে দুই লাখ পাউন্ড গ্রহণ করত। প্রকৃতপক্ষে তার কাজ ছিল বিভিন্ন আরব জাতীয়তাবাদী দলের সাথে জোট গঠন করে তার গোয়েন্দা তৎপরতা এগিয়ে নেয়া এবং শেষ পর্যন্ত মুসলিম ভূমিতে গৃহযুদ্ধ উস্কে দেয়া।

সে আরবের কিছু জাতিয়তাবাদী দলের সাথে মজবুত সম্পর্ক স্থাপন করেছিল যারা অটোমান সাম্রাজ্যে্কে বিভক্ত করতে চেয়েছিল। নির্দিষ্ট করে বললে মক্কার আমীর শরীফ হোসাইন এর সাথে আঁতাত করেছিল; যিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশধর, বংশানুক্রমে যারা ৭০০ বছরেরও বেশি সময় মক্কা শাসন করার মর্যাদা লাভ করেছিল।

১৯১৫ সালে শরীফ ব্রিটিশদের জানিয়ে দিলেন যে, তিনি খিলাফাহর বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে চান। যদিও তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে অটোমানদের প্রতি বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করছিলেন, কিন্তু তার পুত্র আবদুল্লাহ উদ্বিগ্ন ছিলেন তাদের ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্য নিয়ে। তাই তাঁর পিতাকে ব্রিটিশদের সাথে গোপন আলোচনার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। শরীফের বংশধারা দেখে ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল তিনি এমন কেউ যার মাধ্যমেই আরবরা এসবের বৈধতা দেবে এবং তিনি হতে পারবেন তাদের পরিকল্পনার আদর্শ অংশীদার।

শরীফ এবং মিশরে ব্রিটিশ হাই কমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমোহন (যিনি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সর্বোচ্চ পদবীর কূটনিতীবিদ) এর মধ্যকার অগণিত পত্র আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়ে একটি ঐক্যমত গৃহীত হয় অটোমানদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাবার জন্য এবং শরীফের স্বঘোষিত খেলাফতকে অনুমোদন করার জন্য। সেটি ছিল একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্র যা  হেজাজ, সিরিয়া এবং মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত, বর্তমান মানচিত্রে সৌদি আরবের বেশির ভাগ, সিরিয়া, কুয়েত, ইরাক এবং আরও কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। এই মহাপরিকল্পনা ম্যাকমোহন চুক্তি নামে পরিচিত।

এভাবেই ১৯১৬ সালের জুনে টি.ই. লরেন্সের তত্ত্বাবধানে আরব বিদ্রোহের সূচনা হয়। আরবরা অটোমান বাহিনীকে আক্রমণ করে এবং খুব দ্রুত আরব পেনিনসুলা এবং দামাস্কাসকে সংযুক্তকারী রেলপথ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলশ্রুতিতে অটোমানদের অতিরিক্ত বাহিনী আসা বন্ধ হয়ে যায়। অবিলম্বে আরব ভূমি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ১৯১৬ সালের অক্টোবর মাসে শরীফ নিজেকে হেজাযের রাজা ঘোষনা করে।

এরপর আরবরা ম্যাকমোহনের জন্য প্রতীক্ষায় ছিল কখন সে তার ওয়াদা রক্ষা করবে কিন্তু সেই প্রতীক্ষা ১৯১৯ সালের প্যারিস শান্তি আলোচনা পর্যন্ত জারি ছিল;  ব্রিটিশরা যে পরস্পরবিরোধী চুক্তি করেছিল অন্য আরেকপক্ষের সাথেও তা জানার আগ পর্যন্ত।

সাইকস-পিকট চুক্তি

নভেম্বর ১৯১৫ এবং মার্চ ১৯১৬ এর মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের সাথে রাশিয়া এবং ফ্রান্সের একটি গোপন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভাংগনোন্মুখ অটোমান সাম্রাজ্যকে নিজেদের ভেতর ভাগাভাগি করা। রাশিয়া খুব বেশি চেয়েছিল তুরস্ক এবং আর্মেনিয়া, ফ্রান্সের আগ্রহ ছিল লেবানন এবং সিরিয়ার প্রতি আর বৃটেনের চোখ ছিল ফিলিস্তিন এবং আরবের দিকে যার মাঝে জর্ডান আর ইরাকও অন্তর্ভূক্ত ছিল।

মার্ক সাইকস (বৃটেন) এবং ফ্রানকইস জর্জেস-পিকট (ফ্রান্স) এর নেতৃ্ত্বে  বিভিন্ন অনুমান এবং পছন্দের উপর ভিত্তি করে একটা মানচিত্রের চারপাশে জড়ো হয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো বিভিন্ন রেখা টানা হয়। সেখানে অবস্থানরত জাতি-গোষ্ঠী এবং সাম্প্রদায়িক পার্থক্য নিয়ে কোনপ্রকার চিন্তাভাবনা না করেই। সাইকস পিকট কারোরই মুসলিম ভূমি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না আর কখনও তারা সেখানে ভ্রমণও করেনি। বরং এটা ছিল শুধুমাত্র একটা মানচিটের উপর দাগাদাগি, যা বর্তমান সময়েও ব্যাপকভাবে দুনিয়ার মুসলিম দেশগুলোর সীমানা নির্দেশ করে।

রাশিয়ার সম্মতিতে ১৯১৬ সালের মে মাসে বৃটেন ও ফ্রান্স এর মধ্যে এই গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যাই হোক পরবর্তীতে  রাশিয়া অভ্যন্তরীন বিপ্লবের সম্মুখীন হয়েছিল ফলে ১৯১৭ সালে বলশেভিকরা ক্ষমতায় আসে। তাদের চেষ্টা ছিল পূর্বসুরি জার সম্রাটদের ছিদ্রান্বেষণ, সুতরাং সাইক্স-পিকট চুক্তির অন্ধকার দিক সবার সামনে চলে আসে। ফলে রাশিয়া অটোমান সাম্রাজ্যের ভাগ দাবী করার অধিকার হারায়।

চুক্তির বিষয়টি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়লে আপাত বিব্রত ব্রিটিশদের দ্বিমুখীতা দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যায়। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় স্যার হেনরি ম্যাকমাহন পদত্যাগ করেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়া স্যার রেগিনাল্ড উইংগেট প্রতিশ্রুতিগুলি সময়মতো বহাল থাকার ব্যাপারে (কপটভাবে) শরীফকে সন্তুষ্ট করতে সফল হয়েছিল।

বেলফোর ঘোষণা

পূর্বে উল্লিখিত সেই অভ্যন্তরীণ দ্বিমুখীতা নিয়েই ব্রিটিশরা মুসলিম ভূমিগুলো নিয়ে আরও একটি আলোচনা করেছিল। ১৮৯৭ সালে থিয়ডর হারযেল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত The powerful World Zionist Organization (WZO) এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনে ইহূদিদের জন্য একটি স্বদেশ গড়ে তোলা। ইউরোপজুড়ে ইহূদীরা ক্রমবর্ধমান ইহূদীবিদ্বেষের সম্মুখীন হচ্ছিল এবং এজন্য নিজেদের একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাটা তাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাড়িয়ে ছিল।

প্রথমে ব্রিটিশরা  জায়োনিষ্টদেরকে পূর্ব আফ্রিকার ৫০০০ বর্গমাইল এলাকাকে তাদের স্বদেশ হিসেবে প্রদান করতে চাইল। এটি ‘ব্রিটিশ উগান্ডা প্রোগ্রাম’ নামে পরিচিত, যদিও বর্তমানে এই ভূমি কেনিয়ার অন্তর্ভূক্ত। এই প্রস্তাব ১৯০৩ সালে WZO এ আলোচিত হয়েছিল এবং অবশেষে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল – লক্ষ্য তখনও ফিলিস্তিনই ছিল। ব্রিটিশ সরকার জায়োনিষ্টদের প্রতি সহায়ক থাকার সম্ভাব্য কিছু কারণ হচ্ছে-

১।  ইংল্যান্ডে ইহূদী জনগোষ্ঠী বেশি ছিল এবং তারা ছিল তুলনামূলকভাবে ধনী ও ক্ষমতাবান। তাই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলই ছিল জায়োনিষ্টদেরকে সহায়তা করার কারণ।

২। WZO এর একজন প্রভাবশালী নেতা কেইম ওয়েইযম্যান ছিল ইউরোপের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের একজন আবার (১৯০৫ সালের দিকে) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আরথার বালফোরের খুব কাছের লোক। পরবর্তিতে ওয়েইযম্যান বালফোরকে রাজী করিয়েছিল ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করার জন্য।

ওয়েইযম্যানের ব্যবসা ছিল বোমা এবং বিস্ফোরক তৈরির মূল উপাদান এসিটোন (acetone) এর উৎপাদন। যখন বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তখন এসিটনের দাম এবং সহজলভ্যতা স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগত গুরুত্ব পেয়েছিল এবং তাকে উৎপাদন ১০০০% বাড়িয়ে দেয়ার জন্য বলা হয়েছিল।

এ কারণেই কেইন ওয়েইযম্যানকে খুশি রাখা ব্রিটিশদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। যখন তাকে এসি্টোন এর এই চড়া দামের কথা বলা হয়েছিল তার উত্তর ছিল সে অর্থের প্রতি আগ্রহী নয়, তার আগ্রহ শুধু ফিলিস্তিন।

৩। সে সময়ে ব্রিটিশ সহায়তার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ ছিল ইহূদীধর্মমতের সাথে খ্রিষ্টানদের একাত্মতা এবং যিশুর প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি পূরণ। বর্তমানেও অনেক খ্রিষ্টানের কাছে বিষয়টি শিরোধার্য বিশেষত ইভানজেলিকাল খ্রিস্টানদের কাছে যারা ইহুদীদের থেকেও আরও বড় সমর্থক ছিল জায়োনিজম এর। প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ (১৯১৬-১৯২২) নিজেই ছিল একজন ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান। ইহুদীদের ফিলিস্তিনে বাস করা নিয়ে তাদের আকাঙ্খা ছিল যে তা ইহূদীবাদ অনুযায়ী চলবেনা বরং তা হবে তাদের মসীহ যিশু (আ’আলাইহিস সালাম) এর প্রত্যাবর্তনের নিয়ামক।

লক্ষ্যনীয় যে, তখন আমেরিকা জায়োনিস্ট এজেন্ডার একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলনা। বস্তুত আমেরিকাতে বসবাসকারী অনেক মূলধারার ইহূদী ফিলিস্তিনকে তাদের স্বদেশ বানানোর আইডিয়াকে উপহাস করত। তারা কয়েক দশক পরে জায়োনিজমের পক্ষ নেয় শুধুমাত্র হিটলারের উত্থানের কারণে।

অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যাওয়ার কিছুকাল পরে ব্রিটিশ কেবিনেটে জায়োনিস্টদেরকে এই প্রতিশ্রুত ভূমি প্রদানের ব্যাপারে আলোচনা শুরু হল। আগস্ট ১৯১৭ এর আগ পর্যন্ত এই বাদানুবাদ চলেছিল। কেবিনেট এই প্রস্তাবেরর পক্ষে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু কেবিনেটের একমাত্র ইহূদি সদস্য এডউইন স্যামুয়েল মন্টেগু প্রবল আপত্তি করেছিলেন। তার মতামত ছিল  এই পদক্ষেপটি হবে মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশাল এক বিপদের ঘনঘটা এবং অভূতপূর্ব সব শত্রুর উদ্ভব ঘটাবে।

এডউইন স্যামুয়েল মন্টেগু একজন প্র্যাকটিসিং ইহুদী হিসেবে জায়ানিজমের প্রভাব সম্পর্কে অবগত ছিলেন। যাকে তিনি ‘ক্ষতিকর রাজনৈতিক ধর্মবিশ্বাস’ নামে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি প্রশংসা করে বলেছিলেন যে,

আবহমানকাল থেকে মুসলিম এবং ইহুদীরা কখনই পরস্পরের শত্রু ছিল না, আর মুসলিম ভূমিগুলোই খ্রিষ্টানদের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ইহুদিদের আশ্রয়স্থল ছিল– কিন্তু এই পদক্ষেপ এখন শত্রুতা সৃষ্টি করবে।

সে সময় ইহূদীরা ছিল ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার কেবলমাত্র ৫-১০ শতাংশ।

যাই হোক মন্টেগুর মতামত ছিল সংখ্যার দিক দিকে লঘু সুতরাং প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী স্যার এডওয়ার্ড বালফোর সাগ্রহে লর্ড রথসচাইল্ড এর কাছে ২ নভেম্বর ১৯১৭ সালে লিখেছিলেন এই সংবাদ ঘোষণা করে দিতে এবং WZO তে পাস করাতে। ঘোষণাপত্রের সংক্ষিপ্ত রূপ

মহামান্য সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী ফিলিস্তিনে ইহুদীদের ‘স্বদেশ’ প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকবে এবং এই অর্জনকে সহজ করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা জারি রাখবে। পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে যে এমন কিছু করা যাবে না যা নাগরিকদের নিকট পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়  এবং ফিলিস্তিনে অ-ইহূদী সম্প্রদায়দের নাগরিক এবং ধর্মীয় অধিকার অথবা অন্য দেশগুলোতে ইহূদীরা যেমন অধিকার এবং রাজনৈতিক মর্যাদা উপভোগ করে তা ক্ষুন্ন করে।

তিনটি পরস্পর বিরোধী প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৯১৯ সালের প্যারিস শান্তি আলোচনায় অনেক কিছুই দখল করার ছিল যেখানে ব্রিটিশরা চেয়েছিল সকলকেই খুশি রাখতে। মুসলিমরা ব্রিটিশদের এই বিব্রতকর দ্বিমুখী আচরণে উদ্বিগ্ন ছিল। তখনও তারা এরকম ছিল বর্তমানেও কোন না কোনভাবে তাদের পাশে থাকছে এবং সরলমনে তাদের ফাঁকা বুলিগুলো বিশ্বাস করে যাচ্ছে।

শেষাংশে আমরা ১৯১৯ সালের আলোচনার ফলাফলগুলো নিয়ে আলোচনা করব এবং সেই আলোচনা সংশ্লিষ্ট কিছু অনুসরণীয় বিষয় বিবেচনা করব।

 

মুসলিম বিশ্বের রূপায়ন (৩)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মুসলিম ভূমিগুলো তিনটি পরষ্পর বিরোধী চুক্তির ভিত্তিতে ভাগ করার জন্য চিহ্নিত করা হয়-

IIRT Arabic Intensive

১. মক্কার শরীফকে আরবভূমিগুলোর সমন্বয়ে খিলাফত প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় ( ম্যেক্মেহন প্রতিশ্রুতি)

২. ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিজেদের মধধে এই ভূমিগুলো ভাগ করে নেয় ( সাইক্স- পিকো চুক্তি)

৩. জায়োনিস্টদের ফিলিস্তিনে বাসভূমির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় ( বেলফার ঘোষণা)

১৯১৯ সালের প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে বিভিন্ন দল তাদের নিজস্ব দাবি নিয়ে আলোচনা করতে আসে। টি . ই. লরেন্স তার কাছের বন্ধু ফয়সাল বিন হোসেন ( শরীফের তিন ছেলের একজন) সহ তাদের আরব খিলাফতের দাবি নিয়ে আসে। চেঈম ওয়িজমেনও সেখানে ছিল জায়োনিস্টদের জন্য ফিলিস্তিনের দাবি নিয়ে আর স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটেন ও ফ্রান্স সাইক্স পিকো চুক্তি নিয়ে কথা বলতে আসে।

বেলফার ঘোষণা/ কিং-ক্রেন কমিশন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এই বিষয়গুলোর মধ্যে জায়োনিস্ট এর বিষয়ে নিরপেক্ষ ছিলেন এবং ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে নিরপেক্ষ গবেষণার মতামত দেন। এই গবেষণার দায়িত্বে ছিলেন হেনরি চারচিল কিং এবং চার্লস র ক্রেন। এই দুজন আরবি ভাষার ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান রাখতেন এবং তারা তৎক্ষণাৎ আরবে ভ্রমণ করেন। সেখানে তারা কয়েক মাস অবস্থান করে বিভিন্ন জরিপ চালান ও বিভিন্ন গোত্রের সাথে কথা বলেন। এটি কিং-ক্রেন কমিশন নামে পরিচিত।

তারা এই সীদ্ধান্তে আসে যে, ফিলিস্তিনে অবস্থানকারী বর্তমান অধিবাসীদের অধিকার সম্পূর্ণ পদদলিত না করে সেখানে ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। তাদের মতে, “জায়োনিস্টরা বিভিন্নভাবে ফিলিস্তিনে বসবাসরত সমস্ত অ-ইহুদিকে সম্পূর্ণভাবে তাড়াতে চাইছিল। উল্লেখ্য যে, শতকরা ৯০ ভাগ জনগোষ্ঠী জায়োনিজম এর ঘোর বিরোধী ছিল। [1]

কিং ক্রেন কমিশন জোরালো ভাবে মতামত দেয় যাতে এই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। তাদের রিপোর্টটি খুব সম্ভবত প্রেসিডেন্ট উড্র উইলসন পড়ে দেখতে পারেননি কারণ তিনি এই রিপোর্টটি পাবার পরদিন স্ট্রোক করেন এবং এর প্রকাশনা ১৯২২ সাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল। তাদের এই গবেষণার ফলাফল উপেক্ষা করা হয়েছিল যেহেতু এই ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তে আরও অনেক ইন্ধন ছিল যা এর স্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে অগ্রাহ্য করে।

জায়োনিস্টদের তাদের কাঙ্খিত বাসভূমি দেয়া হয় ফিলিস্তিনে, যদিও তাদের চুড়ান্ত লক্ষ্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র যা কিনা বর্তমান ইসরাইল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাস্তবতা লাভ করে। তার পূর্বে লর্ড কার্জন ( যে কিনা ১৯১৯ সালে বেলফার চুক্তি অনুসরন করে) চাঈম উইজমেন এর ব্যাপারে মন্তব্য করেন, “ আমি মোটামোটি নিশ্চিত যে,… উইজমেন তোমাদের এক রকম কথা বলে বা তোমরা জাতীয় ঘর বলতে একরকম বুঝলেও সে ভিন্ন কিছুর পিছে ছুটছে। সে স্বপ্ন দেখে একটি ইহুদি রাষ্ট্রের, একটি ইহুদি জাতির, কিছু অধীনস্থ আরব লোকবল ও আরও কিছু যা কিনা ইহুদিদের দ্বারা শাসিত হবে। ইহুদিরা হবে সেই রাষ্ট্রের কর্তা এবং সেভাবেই সে ব্রিটিশ প্রশাসন প্রভাবিত করছিল। সে এসব মূলত পর্দার আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রন করছিল ব্রিটিশ সাহায্যের অধীনে”। [২]

পুরো ইউরোপ থেকে ১৯১৯ সালের পর থেকে ফিলিস্তিনের সীমানায় ইহুদিদের আসা শুরু হয়। সেখানে কিছু জমি ফিলিস্তিনিদের থেকে নেয়া অথবা দখল করা শুরু হয়। এর সাথেই জায়োনিজমের নামে অবিচার ও দখলদারিত্ব শুরু হয় যা কিনা আজও চলে আসছে। তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এ সংক্রান্ত অগণিত ঘটনা, যুদ্ধ, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জায়োনিস্টদের সশস্র অভিযান এবং এসবের ফলে ফিলিস্তিনিদের উপর আসা প্রভাব সবার‍ই জানা আছে এবং তা আলোচনার জন্য ভিন্ন ফিরিস্তি লেখা যাবে।

সাইক্স-পিকো : ফ্রান্স

ইতোমধ্যে সাইক্স- পিকো চুক্তি অনুমোদিত হওয়ায় সিরিয়া ফ্রান্সের অধীনস্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ফ্রান্স এখানে মারোনী খ্রিস্টানদের জন্য লেবানন নামের এক নতুন রাষ্ট্র তৈরী করে। এই ভূমীর কর্তৃত্বে ফ্রান্স দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিল। এর মাঝে তারা সিরিয়ান বিদ্রোহ দমন করে ১৯২০ এর শেষের দিকে। তারা দ্রুজ ও আলাউই দের জন্য ও ভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করে।

ফ্রান্স তার শাসনামলে এমন কাউকে খুজছিল যে কিনা তাদের অনুগত থেকে অন্যান্য সিরিয়ানদের শাসন করবে। তারা এরকম পেয়ে গেল আলাউইদের। তারা সেসময় আনপড়া অশিক্ষিত ছিল এবং একইসাথে হিংস্র ও নিষ্ঠুর। তারা প্রায়ই সুন্নি মুসলিমদের জমিজমা দখল করত ও তাদের হত্যা করত। সাধারণ সিরীয়রা তাদের হিংস্র আচরনে ভীত ছিল।

ফ্রান্স তাদের সামরিক, শিক্ষা ও বিভিন্ন সাহায্য দিয়ে ক্ষমতায় বসায়। মোটকথা, তারা তাদের “সভ্য” করে গড়ে তোলে তাদের মত করে এবং অন্যান্য সিরিয়দের উপর প্রাধান্য দেয়। আলাউইরা সেনাবাহিনীতে অধিক হারে যোগ দেয় ও তাতে তাদের বিস্তর প্রভাব গড়ে উঠে। এতে স্বাধীনতার পর তারাই ক্ষমতায় আসে। জনৈক ইতিহাসবিদ ডানিয়েল পাইপস, আলাউইদের ক্ষমতায় আসাকে ভারতের অস্পৃশ্যের মহারাজা বনে  যাওয়ার সাথে তুলনা করেন। [৩]

ফ্রান্সের সাইক্স –পিকো চুক্তির এরূপ প্রয়োগের ফলাফল আজও স্পষ্ট। তাদের বংশধরদের মধ্যেই বর্তমানের খুনি বাশার আল আসাদ ও তার পিতা হাফিজ আল আসাদ এর প্রকাশ ঘটে যারা আজও তাদের অত্যাচার অব্যাহত রেখেছে।

সাইক্স-পিকো : ব্রিটেন

ব্রিটেন তাদের নিজেদের জন্য এই চুক্তির সিংহভাগ রেখেছিল। তাদের দখলে ছিল ট্রান্সজর্ডান( বর্তমানের জর্ডান, ফিলিস্তিন ও ইসরাইল), ইরাক ও আরব(হিজাজ)। ব্রিটিশরা এবার চিন্তা করছিল কিভাবে শরীফের উচ্চাখাঙ্খা ও ইহুদিদের ফিলিস্তিনে ভুমির ব্যাপারে সমঝতা করা যায়। শেষ পর্যন্ত তারা এই সীদ্ধান্তে আসল যে শরীফের তিন ছেলের মধ্যে এলাকা ভাগ করে দেয়া হবে যা কিনা শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের অধীনেই থাকবে। আলী বিন হোসেন হিজাজ/ আরব এর অধীকার পায় এবং নিজেকে হিজাজের রাজা ঘোষণা করে। তার শাসনামল ছিল অল্প কিছুদিনের, এক বছরের কিছু বেশি। ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। তারপর আল সউদ পরিবার যারা কিনা এলাকা ও ক্ষমতা উভয়ই বৃদ্ধি করছিল তাকে উৎখাত করে মক্কা দখল করে। এতে মক্কায় ৭০০ বছরের হাশেমী ক্ষমতার পতন ঘটে। দুরভাগ্যবশত তবে কাঙ্খিত ভাবেই সউদ পরিবারও ব্রিটিশ কর্তৃক সমর্থিত হয়েই ক্ষমতায় যায় ও আজও ক্ষমতায় আছে।

আব্দুল্লাহ বিন হোসেন জর্ডানের কর্তৃত্ব পায় ও নিজেকে জর্ডানের হাশেমী রাজত্বের রাজা দাবী করে। এই রাজত্ব আজও বিরাজমান এবং যদি ক্ষমতায় থাকা সফলতা বুঝায় তাহলে ব্রিটিশ মনোনিত একমাত্র সফল নেতা। তার নাতি হোসেন ১৯৫২ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত রাজা ছিল। হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ আজও জর্ডান শাসন করে।

শরীফের তৃতীয় ছেলে ফয়সাল বিন হোসেন ছিল টি ই লরেন্সের সবচেয়ে কাছের। তার দায়িত্ব পড়ে ইরাকের, যেখানে অধিকাংশ লোক তাকে চিনতই না। ফয়সাল আমৃত্যু, ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত শাসন করে। তার মৃত্যু বিষপ্রয়োগে হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তার মৃত্যুর পর তার ছেলে গাজী ৬ বছর শাসন করে। গাজীর মৃত্যুর পর তার ছেলে ফয়সাল উত্তরাধিকারী নির্বাচিত ছিল কিন্তু সে ছিল বেশ ছোট। তাই গাজীর চাচাত ভাই তারপর ক্ষমতায় আসে ও ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে।

দ্বিতীয় ফয়সালের ক্ষমতা ১৯৫৮ সালে সেনা বিদ্রোহের মাধ্যমে শেষ হয়।  এ বিদ্রোহের নেতা ছিল আব্দুল করিম কাসিম যা কিনা সে বছরের জুলাই মাসে হয়েছিল।  সে ফয়সালের পুরো পরিবারকে( নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ) প্রাসাদের আঙিনায় হত্যা করে। শাসক পরিবারের ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য সুলভ আচরন ছিল অভ্যুত্থানের কারন যার মধ্যে ১৯৫৬ সালের মিশর আক্রমণও ছিল। সাধারন জনগন তাদের মুসলিম ভাইদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল ব্রিটিশ আনুগত্যের তুলনায়। সেনা অভ্যুত্থান বা’স পার্টি কর্তৃক সমর্থিত ছিল যারা আশা করছিল, নতুন নেতা কাসিম তাদের প্যান- আরব দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার বিপরীত। এতে তার ১৯৫৯ সালে আরেক আর্মি অফিসার সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে পুনরায় সামরিক অভ্যুত্থান এর ব্যর্থ চেষ্টা করে। তবে ১৯৬৩ সালে আরেকটি সেনা অভ্যুত্থান ও বিভিন্ন দলের ক্ষমতার কোন্দল শেষ পর্যন্ত সাদ্দাম হোসেন কে উপ রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৬৮ সালে ক্ষমতা দেয়। সে অবশেষে ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতিকে উৎখাত করে শক্ত হাতে শাসন শুরু করে। তার শাসন এর পর আরও ২৪ বছর ছিল।

সেভ্রেস ও লাউসেন এর চুক্তি

শান্তি চুক্তির আরেকটি দিক ছিল উসমানী খিলাফতের সীমানার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহন। রাশিয়া সাইক্স পিকো চুক্তির কোন পক্ষ না হওয়াতে সেভ্রেস এর চুক্তি ( যা কিনা ১৯২০ সালে ১৫ মাস সমঝতার পর গৃহীত হয়) অনুযায়ী ব্রিটিশদের তার নিয়ন্ত্রন দেয়। তুর্কিদের উপর বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তাদের অর্থনীতি ব্রিটীশদের অধীনে চলে যায় এবং এর সামরিক শক্তি সীমাবদ্ধ রাখা হয় একে নিয়ন্ত্রনের জন্য।

এই চুক্তির সিদ্ধান্ত সমুহ জার্মানির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশ কঠিন ছিল এবং এতে তা খুব বেশি দিন টিকে নি। এই চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে আলোচনার সময় মিত্রবাহিনীর প্রক্সির সাথে তুরুস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলতে থাকে। মুস্তফা কামাল “আতাতুরক” এর নেতৃত্বে এই যুদ্ধ মিত্র বাহিনীকে পুনরায় নতুন সমঝোতায় আনতে সক্ষম হয়।

এই বিরোধের নিস্পত্তি ঘটে ১৯২৩ সালের লাউসেন এর চুক্তির মাধ্যমে ( যা কার্যকর হয় আগস্ট ১৯২৪ সালে)। এতে নতুন তুরুস্ক প্রজাতন্ত্রের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। এটি ছিল পূর্বেকার উসমানী খিলাফতের সীমানার ছয় ভাগের এক ভাগ। এর সাথে খিলাফতের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে যা কিনা খলিফা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময় থেকে সেদিন পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল মাজিদ নির্বাসিত হন। মুস্তফা কামাল নতুন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হয়।

কামাল কট্টর বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী ছিল। সে তুরুস্ক থেকে সকল আরব অথবা ইসলামিক প্রভাব ধ্বংস করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। সে খুব দ্রুত আরবীতে কুরআন তিলাওয়াত নিষিদ্ধ করে এবং আজান ও নামাজ তুর্কি ভাষায় পড়ার নির্দেশ দেয়। সে হিজাব নিষিদ্ধ করে ও মাদ্রাসা বন্ধ করে। সে পরবর্তী প্রজন্ম স্কুল থেকেই কট্টর বামপন্থী হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। তার এই বামপন্থী পরিবর্তন কয়েক দশক ধরে প্রভাব বিস্তার করে। বরং বিগত কয়েক বছর পুরো দেশে ইসলামি পরিবর্তনের কিছুটা জোয়ার এসেছে।

এসব আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সেই হাদিসটি মনে করিয়ে দেয়

অন্যান্য জাতিরা তোমাদের আক্রমনের জন্য সেভাবে পরষ্পরকে আহ্বান করবে যেমন একে অপরকে খাবার জন্য দাওয়াত দেয়। একজন জিজ্ঞেস করলেন, সেটি কি আমাদের সংখ্যার স্বল্পতার জন্য হবে? তিনি উত্তর দিলেন, না, তোমরা হবে সংখ্যায় অনেক কিন্তু তোমরা ভেসে আসা আবর্জনার মত হবে এবং আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের ভয় তুলে নেবেন এবং তোমাদের অন্তরে ওয়াহহান ঢেলে দিবেন। কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, ওয়াহহান কি ইয়া রাসুলাল্লাহ? তিনি উত্তর দিলেন, দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ও মৃত্যুকে অপছন্দ করা। [৪]

শেষ কথা

এই আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল ১৯১৪ সালের পরের ঘটনাপ্রবাহের প্রতি কিছুটা আলোকপাত করা যা কিনা আমাদের আজকের দেখা এই মুসলিম বিশ্বের রূপায়ন করে। এর প্রধান অংশ ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও তুরুস্ক। এর প্রভাব আমরা আজও বেশ ভালভাবেই অনুভব করছি। আরও উল্লেখ্য যে এসব ঘটনা বেশ সাম্প্রতিক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ বেঁচে থাকা ব্যক্তি কেবল ২০১৩ সালে মারা যায়। এমনকি এটিও বলা হয় যে শেষ খলিফার কিছু বংশধর ২০১৪ তেও বেঁচে ছিল (এবং হয়ত এখনো বেঁচে আছে)।

এই আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই মুসলিমদের বেশ কিছু দুর্ঘটনা মুসলিমদের লোভ, অনৈক্য এবং  অপরিপক্বতার প্রভাবেই ঘটেছে। একই সাথে ইউরোপিয়ানদের আত্মকেন্দ্রিক ধারণা ও কপটতাও বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুসলিম বিশ্ব আজ অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত। রাজনৈতিক দুরবলতা এবং পশ্চিমাদের আনুগত্য  নিত্য ব্যাপার।

তবুও আশার অনেক কারণ আছে। আলোচিত ঘটনার মধ্য দিয়ে কয়েক প্রজন্ম পার হয়ে এসেছে। নাস্তিকতার ছত্রছায়ায় ইসলামকে কেবল কিছু উপাসনার অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ করার সম্মিলিত প্রচেষ্টা করা হয়েছে। আজ অনেক উদারপন্থী কথার প্রাধান্য দেয়া হয় সরকারি ও প্রচলিত প্রচার মাধ্যমে যা কিনা ইনশা আল্লাহ অকেজো হয়ে পড়বে। এসবের অধিকাংশই বৃথা। ধীরে ধীরে সমগ্র বিশ্বে ইসলাম জানার ও মানার হার বাড়ছে। পরিস্থিতি ১৯১৮ সালে এরূপ ছিল না। যদিও আলো বেশ দূরে দেখা যাচ্ছে, তবুও এই উম্মাহর অগ্রযাত্রা থেমে নেই এবং এটি কেবল একটি সময়ের ব্যাপার যে ইনশা আল্লাহ আমরা এই উম্মাহর সফলতা দেখতে পারব।

 

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থাবলি

 

[1] www.hri.org/docs/king-crane/syria-recomm.html

[2] www.palestine-studies.org

[3] https://www.theatlantic.com/magazine/archive/1993/02/syria-identity-crisis/303860

[4] Sunan Abū Dāwūd

Largely based on a lecture by Shaykh Yasir Qadhi at the Memphis Islamic Centre:
www.youtube.com/watch?v=qh9awD5KwNY

উৎস: Islam21c.com (মূল আর্টিকেল লিন্ক)

অনুবাদক: শারিকা হাসান, আক্তার জাহান ফেরদৌস মিথুন  , মো: তৌসিফ রহমান

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

 

আইডিসির সাথে যোগ দিয়ে উভয় জাহানের জন্য ভালো কিছু করুন।

 

আইডিসি এবং আইডিসি ফাউন্ডেশনের ব্যপারে বিস্তারিত জানতে  লিংক০১ ও লিংক০২ ভিজিট করুন।

আইডিসি  মাদরাসার ব্যপারে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন। 

আপনি আইডিসি  মাদরাসার একজন স্থায়ী সদস্য /পার্টনার হতে চাইলে এই লিংক দেখুন.

আইডিসি এতীমখানা ও গোরাবা ফান্ডে দান করে  দুনিয়া এবং আখিরাতে সফলতা অর্জন করুন।

কুরআন হাদিসের আলোকে বিভিন্ন কঠিন রোগের চিকিৎসা করাতেআইডিসি ‘র সাথে যোগাযোগ করুন।

ইসলামিক বিষয়ে জানতে এবং জানাতে এই গ্রুপে জয়েন করুন।

Islami Dawah Center Cover photo

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টারকে সচল রাখতে সাহায্য করুন!

 

ইসলামী দাওয়াহ সেন্টার ১টি অলাভজনক দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান, এই প্রতিষ্ঠানের ইসলামিক ব্লগটি বর্তমানে ২০,০০০+ মানুষ প্রতিমাসে পড়ে, দিন দিন আরো অনেক বেশি বেড়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

বর্তমানে মাদরাসা এবং ব্লগ প্রজেক্টের বিভিন্ন খাতে (ওয়েবসাইট হোস্টিং, CDN,কনটেন্ট রাইটিং, প্রুফ রিডিং, ব্লগ পোস্টিং, ডিজাইন এবং মার্কেটিং) মাসে গড়ে ৫০,০০০+ টাকা খরচ হয়, যা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সেকারনে, এই বিশাল ধর্মীয় কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে আপনাদের দোয়া এবং আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন, এমন কিছু ভাই ও বোন ( ৩১৩ জন ) দরকার, যারা আইডিসিকে নির্দিষ্ট অংকের সাহায্য করবেন, তাহলে এই পথ চলা অনেক সহজ হয়ে যাবে, ইংশাআল্লাহ।

যারা এককালিন, মাসিক অথবা বাৎসরিক সাহায্য করবেন, তারা আইডিসির মুল টিমের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবেন, ইংশাআল্লাহ।

আইডিসির ঠিকানাঃ খঃ ৬৫/৫, শাহজাদপুর, গুলশান, ঢাকা -১২১২, মোবাইলঃ +88 01609 820 094, +88 01716 988 953 ( নগদ/বিকাশ পার্সোনাল )

ইমেলঃ info@islamidawahcenter.com, info@idcmadrasah.com, ওয়েব: www.islamidawahcenter.com, www.idcmadrasah.com সার্বিক তত্ত্বাবধানেঃ হাঃ মুফতি মাহবুব ওসমানী ( এম. এ. ইন ইংলিশ, ফার্স্ট ক্লাস )