প্রশ্নঃ মুবাহালা কাকে বলে? বনি ইসরাইলরা কেন মুবাহালা করতে অস্বীকৃতি জানায় ???
উত্তরঃ 🍓🍓‘মুবাহালা’ শব্দটি আরবী মূলশব্দ ‘বাহলাহ’ হতে এসেছে যার অর্থ ‘অভিশম্পাত’ করা। এর অন্য অর্থগুলো হল কামনা করা, ইচ্ছে করা, আশা করা, আকাঙ্খা করা, চাওয়া বা নিজেদের ধ্বংসের জন্য দোয়া করা।
শরীয়তের পরিভাষায় বলা যায় যে, যখন দু’জন ব্যক্তি নিজের বক্তব্যকেই সঠিক ও অপরের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে দাবি করে তখন তারা প্রকাশ্যে আল্লাহর গযব কামনা করতে পারে এই বলে যে,হে আল্লাহ আমি বা আমরা যদি সৎ পথের পরিবর্তে মিথ্যার দাবীতে অটল থাকি তাহলে আমার বা আমাদের ধ্বংস ও গজবের মাধ্যমে শেষ করে দিন, মূলত এটাই মাবাহালা।
ইহুদীরা দাবী করত তারা সর্বশ্রেষ্ঠ ও জান্নাতের একমাত্র হকদার । তারা এসব অদ্ভুত কথা বলে রাসূল সাঃ এর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করত।আর এ অবস্থায় রাসূল সাঃ আল্লাহর নির্দেশে তাদেরকে মুবাহালার প্রস্তাব করে। কিন্তু অভিশপ্ত ইহুদীরা নাসারারা এ প্রস্তাবে কোনভাবেই রাজি হয়নি। এ প্রসঙ্গে কোরআনের আয়াত,
“আপনার কাছে (হযরত ঈসা বা তৌহীদ) সংক্রান্ত জ্ঞান আসার পর যে কেউ আপনার সাথে বিতর্ক করে এবং (সত্য মেনে নিতে চায় না) তাকে বলে দিন: এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্র সন্তানদেরকে এবং তোমাদের পুত্র সন্তানদেরকে, আমাদের নারীদেরকে এবং তোমাদের নারীদেরকে, আমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের নিজেদেরকে, এরপর আমরা (মহান আল্লাহর কাছে) বিনীতভাবে প্রার্থনা করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর অভিশাপ /লানত)দেই।”(আলে ইমরান: ৬১)।
🍓🍓মুবাহালার ঘটনাটি ৯ম হিজরী সনের ২৪শে যিলহজ্জ্ব তারিখে সঙ্গঘটিত হয়। নাজরানের খ্রিশটান পণ্ডিতদের ১৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিকট এসে হযরত ঈসা (আঃ) সম্পর্কে বিতর্ক করার জন্য এসেছিলো (তাদের দাবী ঈসা(আঃ) আল্লাহর পুত্র). উভয়পক্ষ হতে যুক্তি উপস্থাপিত হয়। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পরো যখন তারা সত্য গ্রহণে রাজী হল না তখন আল্লাহর পক্ষ হতে সুরা (আলে-ইমরানের ৫৯-৬১নং আয়াত অবতীর্ণ হয়।
উক্ত আয়াতে হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কোরানের আয়াত অনুযায়ী সন্তানদের স্থলে হযরত হাসান ও হুসাইন(আঃ) কে, নারীদের স্থলে নিজ কন্যা হযরত ফাতেমা রাঃ এবং নিজের স্থলে হযরত আলীরাঃ কে মুবাহিলার ময়দানে নিয়ে যান। যখন নাজরানের খ্রিষ্টান পণ্ডিতেরা এই পাঁচটি নূরানী চেহারাদ্বয় দেখতে পেল তখন আল্লাহর অভিশম্পাতের ভয়ে মুবাহিলা হতে সরে এসে ‘জিযিয়া’ প্রদানে সম্মত হল। আর এভাবে খ্রিষ্টানদের উপর মুসলমানদের বিজয় অর্জিত হল।
🍓🍓বনি ইসরাইলদের মুবাহালা করতে অস্বীকৃতির কারণঃ
√বনী ইসরাইলদের মুবাহালায় রাজি না হওয়ার অন্যতম কারন ছিলো মৃত্যুভয়।এ কারনে তারা দুনিয়ার পার্থিব লোভ-লালসায় মত্ত হয়ে অাখেরাতের জীবন সম্পর্কে বেমালুম ভুলে যায়। এ অবস্থায় তাদের সত্যের পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) কে প্রেরণ করেন।কিন্তু তারা দুনিয়াবি লোভ-লালসায় এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে যে মহানবি (স) এর হক পথের আহবান কে সত্য জানার পরেও তা কোনভাবে গ্রহণ করতে পারে নাই।
√বনী ইসরাইলরা জাতির মুবাহালায় রাজি না হওয়ার আরো একটি কারণ ছিল যে তারা জানতো যে তারা হকপন্থি নয়, এবং হযরত মুহাম্মাদ (স) সত্য নবী। তারা মুসলমানদের যে মিথ্যাবাদী বলছে এটাও যে একটা মিথ্যাচার তারা তা জানতো এবং এ অবস্থায় যদি তারা মুবাহালায় রাজি হয় তবে তারা নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এর শেষ পরিণতি হবে জাহান্নাম।এসব কথা চিন্তা করে তারা কোনভাবেই মুবাহালায় রাজি হতে চায়না। বরং তারা হাজার বছর বাঁচার কামনা করে তা যেকোনো উপায়েই হোক। এটাই বনী ইসরাইল জাতির চিরাচরিত খারাপ চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।
√বনী ইসরাইলরা কেন মুবাহালা করতে অস্বীকৃতি জানাতো তা কোরআনের কিছু আয়াত ও রাসূল সাঃ এর হাদিসের দিকে দৃষ্টি দিলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেঃ
“তাদেরকে বলো, যদি সত্যি সত্যিই আল্লাহ সমগ্র মানবতাকে বাদ দিয়ে একমাত্র তোমাদের জন্য আখেরাতের ঘর নিদিষ্ট করে থাকেন, তাহলে তো তোমাদের মৃত্যু কামনা করা উচিত—যদি তোমাদের এই ধারণায় তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো”। (বাকারা-৯৪)
“নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, তারা কখনো এটা কামনা করবে না ৷ কারণ তারা স্বহস্তে যা কিছু উপার্জন করে সেখানে পাঠিয়েছে তার স্বাভাবিক দাবী এটিই (অর্থাৎ তারা সেখানে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করবে না)৷ আল্লাহ ঐ সব যালেমদের অবস্থা ভালোভাবেই জানেন ৷” (বাকারা-৯৫)
আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐসব ইয়াহূদীদেরকে বলেন: তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় এস, আমরা ও তোমরা মিলিত হয়ে আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন আমাদের দু’দলের মধ্যে যারা মিথ্যাবাদী তাদেরকে ধ্বংস করেন। এরূপ সত্য প্রমাণে ধ্বংসের দু‘আ করাকে মুবাহালা বলা হয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জানানো হয় যে, তারা কখনো এতে সম্মত হবে না। অবশেষে তা-ই হলো। তারা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় আসল না। কারণ তারা আন্তরিকভাবে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে ও কুরআন মাজীদকে সত্য বলে জানত। যদি তারা এ ঘোষণা অনুযায়ী মোবাহালায় আসত তাহলে তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যেত এবং দুনিয়ার বুকে একটি ইয়াহূদীও অবশিষ্ট থাকত না।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: যদি ইয়াহূদীরা মুবাহালায় আসত এবং মিথ্যাবাদীদের জন্য ধ্বংসের প্রার্থনা করত তবে তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যেত এবং তারা জাহান্নামে নিজ নিজ জায়গা দেখে নিত। (মুসনাদ আহমাদ ১/২৪৮, মুসনাদ আবূ ইয়ালা ৪/৪৭,১ বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।)
অনুরূপভাবে যারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসেছিল, তারা যদি মুবাহালার জন্য প্রস্তুত হত তবে তারা ফিরে গিয়ে তাদের পরিবারবর্গ এবং ধন-সম্পদের নাম-নিশানাও দেখতে পেত না। (মুসনাদ আহমাদ হা: ২২২৫, সনদ সহীহ) -আয়েশা খাতুন